৪৯
মংডুর মৃত্যু মুহুর্তের মধ্যেই রেলস্টেশন জুরে মানূষের ঢল নামে। মৃত্যু মানুূষকে পীড়ি দেয়,তাহা যত সহজ মরনই হোক।মানুূষ জীবদ্দশায় মানূষের কল্যানের জন্যই সময় ব্যয় করে থাকে।কিন্ত এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে, অনেকেই ধর্মকে বৃদ্ধাআঙ্গুল দেখিয়ে মংডুর মতোন অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়ে থাকে।কিন্তু তবু মানুষের পক্ষে ধর্মকে তার অবস্থান থেকে একবিন্দুও টলানো সম্ভব হয় না।প্লাটফর্মের লোকজন গারো মেয়েটার কাঁন্নার প্রতিধ্বনিতে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়েছিল মংডুর দু'টুকরো দেহটার কথা।রমা,এই সতেরো বছরের মেয়েটা মংডুুর মৃত্যুর যন্ত্রনা নিজে দাড়িয়ে থেকে তা উপলদ্ধি করল।রেলস্টেশনে লোকজনের ভীরের মধ্যে বদর তাঁকে দু'হাত দিয়ে জরিয়ে ধরে রাখলেন।মংডুর মৃতদেহ নিয়ে যাবার পরই প্লাটফর্ম জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা হল।গারো মেয়েটি তখন বাকশক্তি হারিয়ে একজন বোবা মানুূষের মত হয়ে গিয়েছিল।বদর বলল,
ঃচলো-এখান থেকো চলে যাই
ঃদাড়াও!আর একটুখানি দেখে যাই।
ঃআমার খুব খিদে পেয়েছে
ঃতবে চলো
রমা ও বদর রিক্সা যোগে আবারও কোর্টচত্তরে ফিরল।বিকেল তখুন চারটা বেজে দশ মিনিট। মুহুরীর নিকট থেকে জেলখানার ঠিকানা নিয়েই খাবার খেতে গেল কোর্টের বাহিরে । খাওয়া দাওয়ার পর হোটেলেই কিছুক্ষন বসে রইল।রমা জানতে চাইল,ঃবাবা,ক'টায় ছাড়া পেতে পাবে।
ঃসন্ধার দিকে বলেছে।
ঃআমরা কিভাবে বাড়ি ফিরব?
ঃওসব ছাড়া পাবার পর ভাবা যাবে
আশ্মিন মাস চলছিল, হঠাৎ করেই হোটেলের বাইরে ছমছম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।হোটেলের বিল মিটিয়ে দিয়েই তাহারা বৃষ্টি মাথার নিয়ে রাস্তায় বের হল।জেলখানায় যেতে যেতে দুজনেরি পরনের পোষাক ভিজে একাকার হল। জেল পুলিশের হাতে কাগজ ধরিয়ে দিয়ে তাদের বাইরে অপেক্ষা করতে করতে রাত নেমে এলো।
৫০
বাবা জেলখানা থেকে বের হয়েই বদরকে জরিয়ে ধরে হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগল। বদর বাবাকে কোনদিনও কাঁদতে দেখেনি, চোঁখের জল ধরে রাখতে পারছিল না, কন্ঠ শুকিয়ে গেল মুহুর্তের মধ্যে। বাবাকে জরিয়েও ধরে আজ মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করল বাবা ডাকাত নয়। তার ভিতরেও একটা পিতাসুলভ আচরন আজও রয়ে গেছে।বাবা ছেলের এই মিলন মহোৎসব রমাদি দাঁড়িয়ে দেখে তার চোঁখে জল টলমল করিতেছিল। বাবা ব্যাপারটা লক্ষ করতেই বলল,,
ঃআরো কেও আইছে
ঃবাবা রমা
বাবা রমাকে প্রায় পাঁচ বছর আগে দেখেছিল। তখুন সে খুব ছোট ছিল, আজ সে অনেক বড় হয়েছে।তাইতো চিনতে পারে নাই।
বাবা রমাকেও বুকে টেনে নিল।মাথায় হাত বোলাতে বোলাতো তাহাদের বাড়ির খোজ খবর নিলেন। জানতে চাইল তার মা কেমন আছে?বিপিন কি করছে?রমা বড়দার কথা ঠিকমতো বলতে পারল না তবে একদমে বাড়ির সকলের কথা বলে ফেলল।ক্রমশই রাত বাড়তে লাগল।
ময়মনসিংহ থেকে রাত্রিবেলা বাড়ি ফেরা অতটা সহজ ব্যাপার না। বাবাকে বলতেই সে জানাল যে, পথঘাট তার চেনাজানা।রাত নয়টায় ঢাকা যাইবার একটা বাস আছে, আর সেই বাসেই এলেংগা পর্যন্ত যেতে হবে ।এখন রাত্রি সারে সাতটা। রাতের খাবার খেয়ে তারা বাসস্টপে দাঁড়াইল। গাড়ীতে বসে বাবা ঘুমাচ্ছিল।রমা ফিসফাস করে কথা বলছিল।এবার রমা তার ডানহাতটী বদরের কাদে রাখল এবং বামহাতটা বুকের উপর রেখে নিজেও ঘুমোল।বদর এই উনিশ বছরের ছেলেটি কিছুটা বেসামাল হয়ে বাম হাত দিয়ে চেপে ধরতেই রমা মনে মনে হেসে উঠলে। কিন্তু বদর এর কিছুই জানতে পারল না কারন বাসে তখন আলো নেভানো ছিল।রমা ঘুমের ভান করে নিজেকে বদরের বুকে লেগে রইল।যখন বাস এলেংগা থামল, তখুন রাত প্রায় বারোটার কাছাকাছি। বদর জেগেই ছিল।
৫১
বাবাকে নামতে দিয়ে তারা বাস থেকে নামল।টাংগানো দোকানটা তখুনও খোলা ছিল।দোকানির কাছ থেকে জল নিয়ে রমা ও বাবা হাত মুখ ধুয়ে নিলেন। বাবা পান চিবানোর অভ্যাস ছিলো, দোকান থেকে পান মুখেপুরতেই বাস চলে যায়।রাত অনেক হওয়ায় এলাকাটা একটা ভুতরে পরিবেশ হয়ে গেল।আশপাশে কোন লোকজনের সারা পাওয়া যাইতেছিল না।
হঠাৎ দুরে কোথাও ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ শোনা যাইতেছিল। কিন্ত মিনিট পাঁচেক এর মধ্যেই একদল দস্যু এসে হাজির হলো ।
এই ডাকাত দল, মুলত কালিহাতী একটা হিন্দু বাড়িতে ডাকাতি শেষে ফিরতেছিল।ডাকাত দলের সর্দার প্রথমে ঘোড়া থেকে নামল।বদর বাবার সামনেই দাঁড়িয়ে ,সর্দারকে এদিকে আসতে দেখে রমা ভয়ে বাবাকে ঝাপটে ধরলেন। ইয়াইজা এসেই সোজা বদরকে ঝাপটে ধরেই জোরে জোরে হাসতে লাগল।ডাকাত সর্দার ইয়াইজা অল্প বয়সী একটা ছেলে। বদরদের বাড়ি থেকে প্রায় দশ মাইল দুরে তাদের বাসস্থান। ইয়াইজার বাবাও নামকরা একজন ডাকাত ছিল ।তার বাবার একটা বিশাল ডাকাত বাহিনী ছিল। হঠাৎ একটা ডাকাতিকে কেন্দ্র করে গত দুবছর আগে তাকে মেরে ফেলা হয়।ইয়াইজারা সাত ভাই তারা বিভিন্ন কাজকর্মে নিয়োজিত ছিল। ইয়াইজা ভাইদদের মধ্যে ছোট। বাবার মৃত্যুর পর ইয়াইজা ভাইদেরকেও মেরে ফেলতে চায়। কারন, যারা তার বাবাকে মেরেছে তাদেরকে শেষ না করে বাবাকে দাফন করতে দেয় না।শেষমেশ সকলেই সিদ্ধান্ত নেয় তারা সাত ভাই মিলে ডাকাতই করবে, আর যারা তার বাবাকে মেরেছে তাদেরকেও মেরে ফেলা হবে।দাফনের সংগে সংগে শুরু হয় ইয়াইজার তান্ডবলীলা।ঠিক ঐদিন রাতেই ইয়াইজ্জা মেরে ফেলে গ্রামের বেশ কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ মাতবরকে। গ্রামটিতে পুরুষশুন্য হয়ে যায়,ইয়াইজাদের ত্রাসে।
তারা সাত ভাই একআত্মা একই মনমানষিকতা সবার কাছে। আর অন্যান্য ভাইয়েরা এর জন্যই ইয়াইজাকে সর্দার হিসেবে মানতে থাকে ।ইয়াইজা বদরের প্রাণপ্রিয় দোস্ত। দোস্তকে বহুুদিন পর দে্খে নিজের মধ্যে খুশিতে ভরে উঠল।
৫২
রমাদি এসব এর কিছুই বুঝতে পারতেছে না। বদরও দোস্তকে পেয়ে কাঁন্না ধরে রাখতে পারল না।বদরের বাবাও একসময়কার ত্রাস। আর সেই ত্রাসের সেনাপতি ছিল ইয়াইজার বাবা রইজ্জা। এই রইজ্জা উঠতি বয়সেই বদরের বাবার সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে। দেখতে দুজনই প্রায় একই চেহারার লোক ছিলো।অনেকেই ভুল করত তাদের দুজনকে চিনতে। বদরের বাবা এই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য দুটি জোনে বিভক্তি করে। দক্ষিণের অংশের দায়িত্ব দেয় রইজ্জাকে। যিনি মানিকগঞ্জ ও আরিচা হয়ে ফরিদপুর বৃহত্তর অংশ প্রর্যন্ত নিযন্ত্রন করতে থাকেন। আর এ কারনেই ইয়াইজ্জা ও বদর জন্মানোর সাথে সাথে তাদেরকেও দোস্ত বানিয়ে দেয়।দু গ্রামের সকল লোকজনকে দাওয়াত করেন তাদের দোস্তগিরিতে আর্শিবাদ করানোর জন্য।শুরু হয় বদর আর ইয়াইজ্জার বাল্যকাল। দুজনেই দুই পরিবারে মাতাপিতা হিসেবে নিজেদের মানিয়ে নেয়। বদরের মায়ের কাছে ইয়াইজা ও ইয়াইজার মায়ের কাছে বদর সন্তানের মতই মানুূষ হতে থাকে।বদর মাইনর শেষ করে যখন এই বাঘিল আসে, তখুনই বিচ্ছেদর ডামাঢোল শুরু হয়।দীর্ঘদিন পর দোস্তকে কাছে পেয়ে তার কেবলই মনে হইতে ছিল, ইয়াইজা ডাকাত হবে এটা সে কোনদিনও ভাবেনি।রইজ্জার মৃত্যুর পর বদরের বাবা ডাকাতি পেশা আর ধরে রাখেননি।তিনি এখন ব্যাবসা জমিজমা ও জলা(ইজারদার) নিয়ে ব্যাস্ত । ইয়াইজা বদরের বাবার সাথে বেশ কয়েকবার এ নিয়ে কথা বললেও তাতে তিনি কর্নপাত করেন নাই।বদর এসবের কিছুই জানে না। এমন কি ইয়াইজার বাবার মৃত্যুর সংবাদও।তাইতো দোস্তকে বাবার কথা বলতেই,ঃদোস্ত মিয়া,সালাগো মাইরা ফেলছি।
ঃকাকে?
ঃযেই ডা বাবারে মারছে,হ্যার পোতা হুদদা উপরায়া দিছি।
ঃমেরে ফেলেছেন মানে?
বদরের বাবা পান চিবাইতে চিবাইতে বললঃবাজান তুমারে কই নাই,
সুজা---
ঃ সুজা কাকা?
ঃসুজা অরে পয়লা গুলি করে।।
৫৩
মৃত্য মানূষের কাম্য নয়। মানূষ যুগ যুগ ধরে বেচে থাকতে চায়।একটা দুর্ঘটনা মানুূষকে নতুন কিছু শিখায়।আমরা জানি,ভালো মন্দ বিচার করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার হাতে । মানুষের পক্ষে এর সঠিক বিচার কর সম্ভব না। ইয়াইজা একটা সাধারন ছেলে থেকে আজ ডাকাতে পরিনত।অন্য দিকে তাজউদ্দীন মাতবর তিনি ডাকাত থেকে এখন একজন সাধারন মানুূষইয়াইজা রমাকে চিনতে পারে নাই। মাতবরের মুখে জায়গীরদারের মেয়ে পরিচয় পেয়ে তেমন কিছু না বললেও মেয়েটাকে ভাললাগে।ইয়াইজা মাতবরের পা জরিয়ে ধরে অনেকক্ষন কান্নাকাটি করল। শেষে বদর ও মাতবরের জন্য দুইটা ঘোড়ার ডাকাতী মালপত্র টাংগানো দোকানটার সামনে ফেলে দিয়ে দোস্তকে নিজের ঘোড়ায় এবং বাবা ও রমার জন্য আরেকটি ঘোড়ায় উঠিয়েই সোজা চলতে থাকে সামনের দিকে।তারা এলেংগা থেকে অয়নাপুরের রাস্তা ধরে এগুতে থাকল।সয়া গ্রামের মাঝিপাড়ায় পৌছাইয়া ইয়াইজা ঘোড়া থেকে নেমে দোস্তকে বলল,,ঃদোস্ত দেখতেই মন চায়,তোর যায়গির দারের ম্যায়া।বউ বানায়া ফালা
ঃ ওরা হিন্দু
ঃবাদদেন তো দোস্ত মিয়া।ঃএখানে, ?
ঃ মাঝিরে নেওন লাগব।
খেয়া ঘাটে গভীর রাতে পারাপারের কোন ব্যাবস্থা নাই। তাই ডাকাতদল আগে থেকে পাটনী কে খবর দিয়ে রেখেছে।রমা একবার ভাবল,রতন কাকার ওখানে গেলে কেমন হয়। কিন্তু বদরের বাবাকে বলতে সাহস পেল না।ডাকাতদলের কেউ একজন পাটনীকে ডাকতেই উঠে এলো। খেয়া পার হয়ে বাঘিল পথ ধরতেই রমা মাতবরকে বলল,
ঃবাবা বদর দা কি বাড়ি যাবে?
ঃ দেহি বদরে কি কয়
রমা মনে মনে চাইছিলো যে, বদর বাড়ি গেলে তাদের সাথে নিজেও যাবে।
জেল থেকে ফেরার পথে, বদর ও রমাকে গভীর রাতে সেদিন বাঘিল নামিয়ে দিয়ে যায় , কেননা তাদের সামনে পরিক্ষা।পড়া শোনার জোর প্রস্তুতি চলছিলো।
৫৪
টাংগাইল একটা মহকুমা তথাপি এই অঞ্চল এর মানুূষ গুলো,দেশ, মাটি,রাজনীতি এর সাথে অনেকটা সম্পৃক্ত। কেননা এই অঞ্চলের মানুূষ কৃষিকাজ ও চাকুরীর সুবাধে ঢাকামূখী।প্রায় প্রতিদিনই ভোর হলেই খবর পাওয়া যায় কি হইতেছে ঢাকা শহরে।এই বাঘিল গ্রামেও এ নিয়ে আলোচনার অন্ত নাই।সময় পেলেই বদর লোকজনের মাঝে গিয়ে চুপচাপ শুনতে থাকে দেশে কি হতে চলেছে।
এসবে রমার কোন আকর্ষন নাই।কিন্ত বদর যখন দেশ নিয়ে রমাকে বোঝায় তখন কিছু না বুঝলেও তাঁর কথা শুনতে খুব ভাল লাগে।সারাদিনই পথে ঘাটে আলোচনার ঝড় বইয়ে যাইতেছে। বদর সার্বক্ষনিক তা খেয়াল রাখে।শহরে আন্দলোন রাতারাতি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।একদিকে মেট্রিকুলেশন,অন্য দিকে দেশে সংগ্রামী জনতা, বদর বাড়ি যাবে ভাবছে। কিন্তু রমা কিছুতেই যেতে দিতে চায় না।তাইতো রমা বদরের উপর মনে মনে ভীষন রাগ হইতে লাগল। অবশেষে রমার মা তাদের দুজনকেই যাওয়ার কথা বলতেই রমার মন খুশিতে ভরে গেল। দুজনেই এখন প্রায় প্রাপ্ত বয়স্ক। ওরা নিজেদের ভালমন্দ বুঝতে শিখেছে।কিন্তু এই গোঁরা হিন্দু সমাজে তাদের চাল চলনে পরিবর্তনের আভাস ব্যাপারটাকে সহজ ভাবে মানতে আজকাল কেও রাজি নয়।আড়ালে আবডালে এই ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে অনেকেই অনেক কথা কানাকানি করে।
বিষয়টি রমার মা আজো জানে না। কিন্তু বদর ব্যাপারটা অনুধাবন করছে। বদরও জানতো না কিন্তু হঠাৎ করেই রমার বান্ধবী বিথী,
বদর কে কাছে টানতে না পারায় তার মাকে লেলিয়ে দেয়।মাঝবয়সী এই মহিলা বদরকে সাবধান বানী শুনিয়েও ক্ষান্ত হন না। তিনি আশপাশের প্রায় সবাইকে জানিয়ে রীতিমত একটা হৈ চৈ ফেলেছেন।কিন্তু মা এই সব কথা কানে আসলেও সেগুলোকে আজকাল পাত্তা দিচ্ছেন না।এই প্রথম বদরদের বাড়ি যাইতেছে রমা। মনের মধ্যে একটা ঝড় আচমকা বয়ে যাচ্ছে। বোজানোর মত ভাষা তার জানা নেই।বাঘিল থেকে শিবপুর এই পথটা তার নখদর্পণে। কিন্তু তার পরের পথটা আর জানা নেই।
৫৫
শিবপুর ঘাট থেকে খেয়া পার হয়ে একটা সরুপথ ধরতেই রমা দেখল,সারা মাঠময় সর্ষের হলুদ রং। বিস্তৃত সবুজের মাঠে তখুন সর্ষের আবাদ চলছে।বিকেলের লাল আভা আর সর্ষের রং মিলে, রমার মনেও এবটা আনন্দনঘন মুহুর্তের আবেহে সৃষ্টি হলো।বদরকে মাঝে মাঝে জরিয়ে ধরতে যেয়েও ধরতে পারছে না।বদর সামনের দিকে জোরে জোরে পা ফেলছে। অনেকটা দৌড়োনের মত হেটে চলছে পিছু পি্ছু।একটা মানুষের জন্য তার পিছু দৌড়ানো অতটা সহজ নয়।অতপর পথেই দাড়িয়ে গেল, বদর ভাবল বোধহয় হাটতে পারছে না।পিছনে ফিরে জিজ্ঞেস করল,ঃ কি হয়েছে রমা দাঁড়িয়ে গেলে কেন
ঃ আমি দৌড়াতে পারছি না
ঃ দৌড়ে কেন
ঃ অতটা জোরে হাটা যায়-আরো কতপথ।
ঃ মাইল তিনেক
ঃ এখনও তো সন্ধে হয়নি,,
ঃরাত্রি হলে পথে শেয়ালে ধরবে।
ঃ অ মা গো, আমি শোয়াল দেখে ভয় পাই।
ঃ তবে তারাতারি চলো,,
বদরের হাত ধরে বলল চলুন।
এদিকে সন্ধা ঘনিয়ে আসতে লাগল,আর মাত্র দুমাইল পেরুলেই বাড়ি। হঠাৎ করেই রমা বলে উঠল,ঃ পাড়াগাঁয় লোকজন কি বলছে জানো
ঃ না,,
ঃ তোমাকে আমাকে নিয়ে বলাবলি করছে।
ঃকেন?
ঃ লোকজনের সয্য হচ্ছে না তাই।
ঃহ্যা জানি,ওসব বিথী করাচ্ছে।
ঃ বদর দা তুমি আমাকে পছন্দ করো-
বদর অনেকটা হতভম্ব হয়ে যায়। বদর রমাদের বাড়িতে প্রায় বছর পাঁচেক হলো আছে।রমার বড়দা বিপিন বদরকে ভাইয়ের মতই মনে করে।বিপিন অনেকদিন ধরেই ঢাকায় আছে। বদরের সাথে সেরকম কোন যোগাযোগ না থাকলেও বদর যথেষ্ট সম্মান করে। রমাকে বদর ভালবাসে কি না? এ প্রশ্নের জবাব দেয়া যেকোন লোকের পক্ষে কঠিন বৈকি।
৫৬
এ দিকে সূর্য পশ্চিম আকাশে অস্তনমিত।রমার কথা এড়িয়ে গেল, বদরবলল,ঃ রমা তারাতারি চলো, টুনি তোমায় দেখলে খুব খুশি হবে।জানো, বাড়ি আসলেই তোমার কথা জিজ্ঞেস করে।তুমি দেখতে কেমন,তুমি আমার সাথে কথা বলো কিনা।আমার পরনের কাপড় কে কেচে দেয়।খুব হাসি পাচ্ছে জানো, হাজারটা প্রশ্ন মনের মধ্যে ওর ঘুরপাক খাবে। এই সে দিনের পুচকে মেয়ে।এত কিছু বুঝতে শিখেছে তা বলার মতন না।রমা ততক্ষণ বদরের হাত ছেড়ে পিছনে হাটতে ছিলো, হঠাৎ খেয়াল করতেই দেখল, রমা মাথা নিচু করে হাটছে।চারদিকে ততক্ষণ অন্ধকার ঢেকে গেছে। রমার হাত ধরতে যেয়ে থতমত হয়ে গেল।তারপর বলল,
ঃরমা চারদিকে শোয়ালের আনাগোনা আমার হাতধরে হাটতে পারো,,
এতক্ষণ পর শুধু মুখে বলল হু। ক্থা না বাড়ায়ে জামার এক কোনা ধরে হেটে চলল।এরপর দুইজনেই চুপচাপ সামনের দিকে আগাতে লাগল।বাড়ি পৌছানো পর্যন্ত আর কোন কথা হলো না। বাড়ির বাহির থেকে বদর বলে ঊঠল,ঃএই টুনি দেখে যা কে এসেছে!বাড়ির ভিতর থেকেই টুনি দাদার কন্ঠস্বর চিনতে পেরে ,ঃমা- মা দাদা আইছে
বদর ততক্ষনে উঠোনে দাড়িয়েই মা মা বলে ডাক ছাড়ল,টুনি ও মা পাশে দাঁড়াতেই বলল, ঃ দাদা-এইডা রমাদি
ঃ বেশ পাঁকা হয়ে গেছিস না দেখেই চিনতে পারলি। বাবা কোথায় রে?
ঃ পুবেরপাড়া গেছে এই আসার সময় অইছে।
মা বলল,ঃতোরা হাত মূখ দুয়ে নে, রমাকে জিজ্ঞেস করল ঃতোমার মায় কিবা আছে?
ঃমাসিমা মা ভাল আছে,দুইদিন পর পরিক্ষা তাই মা আপনাদের আর্শিবাদ নিতে পাঠালো
ঃ ভালা করছো
হাতমুখ দোওয়ার জন্য টুনি বদনায় পানি নিয়ে এলো।এর মধ্যেই বাবা এসে হাজির। রমাকে দেখেই বলল,
ঃতোমার মায়রে নিয়া আইলিই পারতা, দুইদিন গরিবের বাড়ি থাইকা যাইত।
ঃ কাকা বাবু নমস্কার
৫৭
ঠিক এমনি সময় বাড়ির বাহিরে থেকে আইজ্জা (বদরের ডাকাত বন্ধু) হাঁক ছাড়ল,ঃবাজানে কি বাড়ি আছেন?
তখুন রাত্রি খুব বেশি নয়, কিন্তু এটা চরাঞ্চল। সন্ধে হলেই চতুর্দিক অন্ধকারে ঢেকে যায়। এশার আজানের সময় হয়ে গেছে। ইয়াইজ্জা বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করেই দেখল, দোস্ত মিয়া এই মাত্র বাড়ি এসেছে। দোস্তকে দেখেও তেমন কিছু বলল না।বাবা টুনিকে বলল,
ঃ আইজারে বসতে দে
ততক্ষনে রমাকে টুনি ঘরে নিয়ে গেছে।বদর বাবার পাশে দাঁড়িয়ে ।
এবার ইয়াইজজা বললঃ বাজান--
বাজান কথাটা বলার সাথে সাথেই বাবা বলল,
ঃবাজান তুমি ঘরে যাও
বদর কিছুই বুঝতে পারল না, কেন বাবা তাকে সরিয়ে দিচ্ছে। ইয়াইজ্জা তখনো মাথা নিচু করে বসে আছে। এবার দোস্তকে বলল,
ঃ দোস্ত মিয়া আমি ঘরে আছি,
ঘরে যেতে যেতে ভাবল যে, কেন বাবা তাকে সেখানে রাখল না।, আবার এও ভাবল দোস্ত ইয়াইজ্জাও তেমন কোন কথা বলছে না।ওদিকে রমা ও টুনি খুব করে হাসা হাসি করতেছে। বদর ঘরে প্রবেশ করতেই টুনি থতমত হয়ে গেল। মা কাছে আসতেই বলল,
ঃ ইয়াইজা প্রায়ই এখানে আসে কি?মা বলল যেঃ না মেলা দিন পর।
বদর পোষাক পরিবর্তন করে মায়ের ঘরে গিয়ে দেখল, মা রমার মাথার চুল বিলি করতেছে। বদরের মনে হলো, মা যেনো তাকে কতকাল ধরে চেনা জানা। টুনি রমার চেয়ে বয়সে অনেক কম হলেও রমার চেয়ে টুনিকেই দুজনের মধ্যে বড় দেখাচ্ছে। মেয়ে মানুষেরা এরকমই হয়, তারা খুব সহজেই একে অপরের সাথে মিশে যেতে খুব বেশি সময় লাগে না।বদর মায়ের কাছে বসতেই টুনি বলল ঃমা তুমি যাও
মা দেরি না করে সাথে সাথেই বাহিরে বেরিয়ে গেল।ওদিকে বাবা আর ইয়াইজ্জার সাথে কি কথা হচ্ছিল তাহা অনুমান করার চেস্টা করেও ব্যর্থ হলো। তাদের কথা বার্তাগুলো ঠিকমত বোঝা যাইতেছিল না।
৫৮
তবে অনুমান করল যে,হয়তো বড় ধরনের কোন সমস্যা হয়েছে। আর তাহা না হইলে ইয়াইজ্জা চোরের মত পায়ে হেটে এখানে আসেনাই। বদর এটা স্পট জানে যে, ইয়াইজ্জার বাবা রইজ্জা, বাবার কাছ থেকে সব সময় পরামর্শ নিয়েই চলতেন।ইয়াইজজা এখুন ডাকাত সর্দার, অধিকাংশ সময়ই সে ঘোড়া নিয়েই চলাফেরা করে থাকে।। এবং একা একা কোথাও বেরোয় না।রমা ও টুনি ওরা ওদের নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল কিন্তু বদরের সেদিকে কোন খেয়ালই নেই। এবার রমা বলল,
ঃবদর দা আমরা কিন্তু খুব সকালেই চলে যাব।
বদর সেদিকে মনোযোগী না হয়েই বলল
ঃউউ, ,
মিনিট পাঁচেক পরেই টুনি ঘর হতে বেরিয়ে গেল মায়ের কাছে। মা তখন রান্নাঘরে। রমা বলল,ঃতিনি তোমার সেই ডাকাত বন্ধু???
ইয়াইজ্জা দেখা না করেই চলে যায়। বদর বুঝতে পারে যে,ইয়াইজ্জা আর আগের মতন নেই। এখুন তার মধ্যে অনেক পরিবর্তন।বন্ধুর চেয়ে তার কাছে ডাকাতি পেশা অনেক বড়।তাকে ফেরাবার আর কেও নেই। বাবা ডাকাতি পেশা ছেড়ে দিলেও ইয়াইজ্জাকে সন্তানেরর মতই ভালবাসে।কারন ছোটবেলা থেকেই ইয়াইজ্জা এবাড়িতে এসে মাকে মা, আর বাবাকে বাবা বলেই সম্ভদন করে। ক্রমেই রাত গভীর হয়ে আসে।টুনি রমাকে নিজের বিছানায় নিয়ে গিয়ে শুয়ে শুয়ে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে গেল। বাবা উঠোনে হেলানো চেয়ারে তখনও বসে আছে। একবার মনে মনে হল, দেশের রাজনীতি সম্পর্কে বাবাকে কথাগুলো বলা দরকার।কেননা ঢাকায় প্রচুর গেঞ্জাম চলছে।কিন্তু কি ভেবে যেন আর তার সামনে যাওয়া হলো না। বালিশে মাথা রাখতেই ঘুমিয়ে গেল।গভীর রাতে হঠাৎই ঘুম ভেংগে যায়। দরজা খুলতেই চোঁখে পরলো ইয়াইজ্জাকে,বাবা তখুনো হেলানো চেয়ারে বসে। দীরপায়ে চোঁখ মুছতে মুছতে সামনে গিয়ে দেখে ইয়াইজ্জার সারা শরীরে ছোঁপ ছোঁপ রক্তের দাগ, ইয়াইজ্জা চোঁখ মেলে একবার দেখল, বদরও তাকে এই অবস্থা দেখে হতভম্ভ হয়ে যায়।কন্ঠো স্তব্দ হয়ে যায়, কথা বলার মত শক্তি হারিয়ে ফেলে ।বাবা, না তাকিয়েই বলল,
ঃবাজান ঘরে যাইয়া গোমাও গা
৫৯
বদর ভয়ে কাপতে ছিলো, বাবার দিকে ফিরে না তাঁকায়েই আবারো রুমে ফিরে আসে। বিছানায় ছটফট করতে লাগল, মানুষ এতোটা বদলে যেতে পারে ভাবতেও কষ্টো লাগে।রাতে দুচোঁখের পাতা এক হইল না। মনের মধ্য একটা সংশয় রয়ে গেল। রাতে কোন ভাবেই জানা সম্ভব হল না যে, কাকে খুন করেছে ইয়াইজ্জা। ভাবল, তাহলে কি এই সব বাবা করাচ্ছে। বাবা অনেকদিন হল ডাকাতি পেশা ছেড়ে দিয়েছে মনে মনে তাইতো বাবাকে অতটা দোষারোপ করল না ।শেষমেশ ভাবল,সকাল হলে নিষ্চয় জানা যাবে। এই ভেবেই রাতে ঘুমিয়ে গেল।সারা রাত ঘুম না হওয়ায়, ঘুম থেকে ঊঠতে সকালে অনেক দেরি হল।এদিকে রমা সকালে স্নান করার পর রুমে আসে, দেখতে পেল বদর উবু হয়ে ঘুমোচ্ছে।তার মাথার বালিশ মাটিতে পড়ে রয়েছে,বালিশটা তুলে মাথার নিচে রাখার চেস্টা করতেই তার ঘুম ভেংগে গেল।চোখ মেলতেই রমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করল,
ঃ বাবা-বাবা কোথায়??
রমাদি বাবা সমপর্কে কিছুই বলতে পারল না।কারন ঘুম থেকে জেগে তাকে দেখতে পায়নি।বদর মা মা মা বলে ডাক ছাড়তেই টুনি (বদরের বোন) দৌড়ে এলো। দরজায় দাড়িয়েই দেখল,রমাদি দাদার মাথার কাছে বসে আছে। চোখদুটো লাল টকটকে। দাদাকে দেখেই বুঝতে পারল, সারারাত ঘুমোয়নি।
ঃ বাবা কোথায়?
ঃ বাবা জলায় গেছে
ঃ আচ্ছা ঠিক আছে তুই যা, মাকে বল আমরা তারাতারিই চলে যাব।
টুনি চলে যাবার পর বদর বিছানা ছেড়ে, দাঁতব্রাশ করতে করতে বাড়ির বাহিরে বের হলো, রমাও তাঁর সাথে বাহিরে বের হল।বদর দেখল,বাবা জলা থেকে ফিরতেছে। তার পিছনে বাড়ির রাখাল কলিমুদ্দিন মাথায় ঝাকা নিয়ে ফিরছে। দুর থেকেই মনে হলো জলা থেকে বোধহয় মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরতেছে।কাছাকাছি আসতেই রমা তাকিয়েই হাসতে লাগলঃ
বাববাহ্ এত মাছ?
বদর মুখের দিকে তাকিয়েই বাবাকে বলল,
ঃ বাবা আমরা এখুনি যেতে চাইছি,
ঃখাই দাই কর, আইজা জলা থেকে ফিরুক।
৬০
বদর, রমা,ও বদরের বাবা তিনজনই আস্তে আস্তে বাড়িতে প্রবেশ করল, আর ততক্ষনে কলিমুদ্দিন বাড়ির অন্দরমহলে চলে গেছে। হাতমুখ দুয়ে রাতের পোষাক পরিবর্তন শেষ হতেই ইয়াইজ্জা দোস্তর সামনে দাড়িয়েই বলল,
ঃদোস্ত মিয়া রাইতে মেজাজটা খারাপ আছিল,আমগোর গেরামে বয়াতিরে চিনবার পারছুন,
ঃ হ্যা তিনি মাতবর না?
হ্যার পোলা খুব ডিসটাব করতে আছিল।পাটি করে, বড় নেতা অইব।
ইয়াইজ্জা এরপর রাতের ঘটনাশরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল কারন একা একজন মানুষের পক্ষে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলা কতটা কষ্টোসাধ্য ব্যাপার ভাবতেই অবাক লাগে।মানুষকে হত্যা সেটা কোন সাধারন বিষয় নয়।ইয়াইজ্জাকে যতই দেখছে ঠিক ততবারই তার সেই ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। দোস্ত -র বাড়ি এক সময় বদর নিজেকে নিজের বাড়িই মনে করতো।দোস্তকে ছেড়ে এক মুহুর্তো থাকতে পারতো না। আজ সে খুনি, সে দস্যু,দস্যু সেটা না হয়
মানছি। কিন্তু তাই ব’লে সে যাকে তাকে হত্যা করতে পারে না।
কারন প্রতিটি মানুষেবই বেচে থাকার অধিকার আছে।বদর মনে মনে ভাবল,ভাগ্যিস রমা এসবের কিছুই জানতে পারল না।জানতে পারলে হয়তো মহা কেলেংকারি হয়ে যেত। মেয়ে মানুষ এমনিতেই সব কথা পেটে রাখতে পারে না। আর খুন খারাপি সেটা জানলে বোধহয় এতক্ষন পুরো বাড়ি মাথায় তুলতো। ভাবতে ভাবতেই রমা এসে হাজির হলো। ইয়াইজ্জাকে দু’হাত তুলে নমস্কার করেই বলল,ঃ বদর দা মা ডাকছে খাবার খেতে,,
ঃ তুমি খেয়ে নাও, আমি আর দোস্ত একসাথে খাব।
ইচ্ছে হচ্ছিলো না ইয়াইজ্জাকে দোস্ত বলে সম্ভেদন করতে। অনেকটা বাধ্য হয়েই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।কিন্তু ততক্ষনে ইয়াইজ্জা বলল,
ঃ দোস্ত মিয়ারে নিয়া আইতাছি
রমা কোন কথা না বাড়িয়ে সোজা চলে গেল মায়ের রুমে।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে রমা ও বদর
বাবার জন্য অপেক্ষা করতেছিল, টুনি রমার হাত ধরে তখনো উঠোনে দাড়িয়ে,
৬১
ইয়াইজ্জা কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তা আর অবশেষে বলা হলো না। বদরের বাবা বাড়ির বাহিরে কে একজনের সাথে কথা বলছিলো।তারপর বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হলো বাঘিল এর দিকে।রমার মনে একরাতেই অনেক কৌতুহলের জন্ম হলো কিন্ত কিছুই বলার সাহস পাইতেছিল না।সার্টের এককোনা ধরে হেটে চলছিল, কিছুদুর যাওয়ার পর বদর রমাকে বলল,
ঃ টুনি তোমার সাথে কোন খারাপ আচরন করছে কি?
ভাংগা ভাংগা গলায় কথা বলছিল, রমা বুঝতে পারে, নিঃচয়ই কোন সমস্যা হয়েছে।কিন্তু তার পরও বদরকে কোন প্রস্ন করল না শুধু বলল,
ঃ টুনি অসম্ভব একটা ভালো মেয়ে। আমি খুব খুশি, বদরদা আমি তোমাকে চিনতে না পারলেও টুনিকে কিন্ত বেশ চিনলাম।
বাড়ি ফিরত দুপুর গড়িয়ে গেল। পথে দুজনের মধ্যে অনেক কথা হয়,।রমাদি বদরকে মন থেকে সত্যি সত্যি ভালবেসে ফেলেছে। কিন্তু রমার মনে হইতেছিল যে, বদরদা হয়তো তাকে কোনদিনই ভালবাসেনি আর ভাসবেও না।টুনি (বদরের বোন) রমাকে খুব পছন্দ করে কিন্তু তা সত্যেও বদরদাকে বলতেও সাহস পায়নি, কেননা পথে যত বারই কোন কথা জিজ্ঞেস করছে বদর শুধু হা অথবা হু বলে সময় পার করেছে।বাড়ি ফিরেই দেখল আজ পিষি আবারো বাড়িতে এসেছে,পীষিকে জড়িয়ে ধরতেই হাও মাউ করে কেঁদে ফেলল।রমা এসবের কিছুই বুঝতে পারল না,বদর তার পরনের কাপড় পরিবর্তন করে মায়ের নিকট দাড়াতেই জানা গেল যে, সুকুমারের মেয়ে শকুন্তলাকে দুদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না।তিথী ও সুকুমারের একমাত্র মেয়ে শকুন্তলা (শুকলা) এবছর ক্লাস এইট শেষ করেছে মাত্র। বদর মায়ের মুখ থেকে শোনার পর মাকে জিজ্ঞেস করলঃকোন ছেলের সাথে ওর?
মা খুব বেশি শিক্ষিত না হলেও বদর এর কথা তিনি বুঝতে পারলেন কি বলতে চাইছে।কয়েক মিনিট নিরব থেকে শুধু এটুকু বলল,
ঃতিথীরে জিগাইতে অইব।
৬২
এরপর বদর স্নান সেরে রুমে ফিরল।রমাদি রুমে পা দিতেই দেখল,ধুতি পরে খাটের উপর দু পা দুলিয়ে বসে আছে বদর। উদম শরীরখানি দেখেই রমার মনে যেন আলপনার ঝড় বইয়ে গেলমাথা নিচু না করে বদরের বুকের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাঁকিয়ে রইল। দুজনার চোখ আড়াআড়ি পড়তেই বলল,
ঃ মহাশয়,মা খাবার নিয়ে বসে আছে?
রমার কথার দুষ্টুমি দেখে সেও বলল,
ঃ আজ্ঞে রাজকুমারী, রানী মাকে বলুন আমি কাল বিলম্ব না করিয়া আসিতেছি
ঃ মার্জনা করিবেন,রানী মায়ের আদেশ আপনাকে একা যাইতে দেয়া হইবে না
হা-হা-হু -হু,,
ঃ রানী মায়ের আদেশ,,হা-হা-হা-হহহ চলুন কি আর করা যাবে।
খেতে বসতেই পীষি বলল,ঃ বদর অনেক খুজেছি শুকলাকে। তুমি কিছু একটা করতে পারো?লোকজন জানাজানি হলে মুখ দেখাতে পারব না,,পীষির দিকে মুখ না তুলে খাবারের দিকে তাঁকাতেই দেখল পাঁঠার মাংস রান্না করেছে। তার থেকে একটুকরো মাংস আর কটা ভাত মুখে দিয়েই বলল,
ঃ পীষিমা আপনিও খেয়ে নিন, আমি আপনাদের ওখানে এখনই রওনা হব।
বিকেলের ঠিক পূর্ব মূহুর্তে, বদর পীষিমায়ের সাথে রওনা হয়ে যায়, গালা পালবাড়ি। রমাদি এতটা ধকল সইবার ছিল না কারন বদরদের বাড়ি থেকে হেটে আসার পর শরীর ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল । রমাদির মা,মেয়েকে বাড়িতে একা রেখে কোথাও যেতে চায় না। কেননা এই বাড়ি থেকে রমাদির পীষিমা একদিন সুকুমারের হাত ধরে বেরিয়ে যায়। রমাদির মায়ের সেই হৃদয়ের ক্ষত আজো তাকে পীড়াদেয়।বদর,পীষির সাথে হেটে চলছে কিন্ত আগবাড়িয়ে কোন কথা জিজ্ঞাসা করার সাহস পাচ্ছিল না। অবশেষে ভয়কে দুর করেবললঃ পীষিমা শুকলা কোথায় আছে জানেন কি?
(পীষি তখুন নিরব হয়ে গেল, বদরের মনে হল সে জানে কোথায় অাছে)
ঃতুমি বাড়িতে চলো তারপর বলব কি হয়েছে।
পথে আর কোন কথা হলো না পীষিরসাথে। অনুমান করার চেষ্টা করেও আদিঅন্ত কিছুই বুঝা গেল না। পাল বাড়ির কাছাকাছি যেতেই একদল উশৃংখল ছেলে পীষির পথ গতিরোধ করল।
৬৩
পীষি বলল,
ঃআমি মুসলমান না কিন্ত তোদের দেখে নেব কারা তোদের বাঁচায়।
রুক্ষ গলায় কথাটা বলতেই লালন নামের একটা ছেলে বদরের সামনে দাড়িয়ে বলে উঠল
ঃকিচ্ছু , ছিড়তে পারবেন না।
ঃপীষিমা শুকলা কোথায়
ঃবাড়িতেই আছে।অর নাম লালন মুসলমান।খুব ডিস্টার্ব করে।
ঃআমাকে চিনিস তুই, আমি তাজের ছেলে,তাইজ্জা ডাকাত,,
এই বলেই বদর ইচ্ছে মত মারতে লাগল অন্য ছেলে গুলো তাইজ্জা ডাকাতের নাম শুনেই দৌড়ে পালাল।লালনকে ততক্ষণে মেরে আধমরা করে ফেলেছে ।মুহুর্তের মধ্যেই লোকজনের ভীর বেড়ে গেল এবং সবাই জানতে পারল উনি তাইজ্জার ছেলে। ভয়ে কেউ কোন কথা বলতে সাহস পেল না। শুকলা ও তার বাবা সুকুমার, ব পাশে দাঁড়াতেই বলল,,,
ঃওর বাবাকে খবর দিন।
তার কিছুক্ষণ পরেই লালনের মান্যগণ্য লোকজন এসে হাজির হলো।বদর একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছে। মাথার পেছনে শকুন্তলা বদরের ডান কাঁধে হাত রেখে স্টাচূর মত দাড়িয়ে রইল।
গ্রাম্য মাতবর রমিজ মিয়া তিনি বদরকে দেখেই চিনতে পারলেন। তিনি এক সময় বদরদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন।তিনি এসেই বদরকে সুকুমারের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। এবং গ্রামবাসীকে আশ্বস্ত করল যে,লালনের বিচার তিনি নিজ হাতে করবেন।রাতেই লালনের বিচার হয় । বদর বুঝতে পারলো
পীষিমা মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছিল, যাহাতে বদরই এসে এই সমস্যার সমাধান করে।তার বিশ্বাস ছিলো তাজ মাতবর এর নাম শুনলে তাঁর মেয়েকে আর কেউ জালাতন করবে না। আর সত্যি সত্যি তেমনটাই ঘটে গেল।
(শকুন্তলা মুলত হারিয়ে যায়নি, সে ঘর হতে বের হতে পারছিল না কিছু বখাটে ছেলের কারনে)রাতে খাবার শেষ করতে অনেক রাত হয়ে গেল। বদরের পক্ষে একা বাড়ি ফেরাও সম্ভব হচ্ছিল না সেই সুবাধে শুকুমার লণ্ঠন জ্বালিয়ে রওনা হতে চাইলে শুকলাও যেতে চাইল তাদের সাথে।শুকলার মা এতে বাঁধা হলনা। অগত্যা তারা তিনজনে রওনা হল ফের রমাদের বাড়ির উদ্দেশ্য।
৬৪
রাত্রি দ্বিপ্রহর, পথে কোন লোকজনের আনাগোনা নাই। কিন্ত খেঁকশিয়ালের আনাগোনা প্রচুর। মনে হল যেন যখন তখুন চড়াও হয়ে যাবে তাদের উপর।
শকুন্তলা বদরকে দুহাত দিয়ে জরিয়ে ধরে তার পায়ের সাথে পা মিলিয়ে জোরে জোরে হাটার চেষ্টা করছে। লণ্ঠনের আলোতে পথঘাট আবছা আবছা দেখা যাচ্ছিল।বাঘিল কে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছাকাছি আসতেই শুকলাকে বলল,ঃ এবার তোরা যা,আমি চলিরে।
শকুন্তলার বাবার চোঁখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল। শুকলা বাবাকে জরিয়ে সেও কেঁদে ফেলল।।এক মুহুর্তের জন্য মনে হল যেন আকাশ বাতাস ভারী গেছে।কিছু বুঝে উঠার আগেই শুকলা বলল,ঃদাদা চলুন,,,
ঃপীষা? (সুকুমার)
:ঃআরেকদিন না হয় যাব।
সুকুমারের মু্খ থেকে কথাটা আর গলা দিয়ে নামল না চোঁখ দুটো মুছতে মুছতে গায়ে হাত দিয়ে আশির্বাদ বয়ে দিল।এবার উল্টো পথে ধীরে পায়ে পা বাড়িয়ে হেটে চলল।লণ্ঠনের আলো যতদুর দেখা গেল ততক্ষুন বদর অন্ধকারে অপলোক নেত্রে দাড়িয়ে রইল।মনে হলো শুকলার বাবা যৌবনে সে যাই করে থাক না কেন, এখুন সে মর্মে মর্মে তা উপলদ্ধি করে।
প্রতিটি মানুষের জীবন ব্যাপ্তিকাল অনেক বড়। কিন্তু ছোটখাটো কোন ঘটনা বয়ে বেড়াতে হয় কারো কারো জীবনে সারা জনম।।আজ নিজ চোঁখে সুকুমারের সেই দৃশ্যই অবলোকন করল।লণ্ঠনের আলো অদৃশ্য হলে শকুন্তলা হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল রমাদের বাড়ির ভিতর। উঠোনে দাড়িয়ে শুকলা হাক ছাড়লঃ রমা,,দি,দি,,দি,,দি,,, রমা,,দি,,দি দি,,
পরদিন বিকেলে পীষিমা এসে শকুন্তলাকে বাড়ি নিয়ে যায়। রমা ও বদর পড়ালেখায় মনোনিবেশ করে। দেখতে দেখতে তাদের পরিক্ষা শুরু হয়ে যায় । তারা দুজনেই ভালভাবে পরিক্ষা শেষ করে। রমাদের বাড়ির দায়িত্ব থেকে এবার বদরের অব্যহতি নেবার পালা। একটা বিচ্ছেদের ডামাঢোল রমার বুকের মধ্যে বেজে উঠতে থাকল।মা বদরকে নিজের সন্তানের মত এতটা দিন আগলে রাখলেও কখনো একবারও মনে হয়নি তাকে একদিন এবাড়ি থেকে বিদায় দিতে হবে।বদরও এবাড়ি থেকে কিভাবে বিদায় নেবে তা ভেবে পাইতেছিল না।ছোটবেলার স্মতিমাখা দিন গুলো চোঁখের সামনে বারবার ভেসে উঠে। রমাদিকে হয়তো কখনএ ভুলতে পারবে না বদর তা নিজেও উপলদ্ধি করে। পরিক্ষা শেষ হবার পর থেকেই বদর সারাদিন রুমের মধ্যেই কাটিয়ে দেয়। রাতেও বদর ঠিকঠাক ঘুমোতে পারে না। সারাক্ষন মনমরা হয়ে থাকে।আজকাল
রমাদিও খুব একটা ঘর থেকে বেরোয় না।
,,,
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন