রমা বুঝতে পারছে বদরের প্রতি নিজেও এই কয়দিনে বেশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। কিন্তু এও ভাবল,বদর কি তার কথা ভাবছে? রমা জানে,বদর হল এবাড়িতে বিপিনদার মত।বদর এমন কোন ব্যাবহার আজ অবধি করেনি যে, রমা কে সে ভালবাসে।
বদর বাড়িতে গিয়ে দেখল,বাবা নদিতে পাট রেখেছে পঁচার জন্য। কিন্ত, উজান থেকে পানির ঢল নাময় নদিতে পানি একের পর এক বেড়েই চলছে। বদরদের বাড়িতে কয়েকজন আইলা (নিম্ন শ্রেনির কর্মচারী) আছে.তাদের সাথে নিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করতে লাগল।, যাহাতে ঝাগ (পঁচানো পাট) নদিতে ভেসে না যায়।টুনি (তানি) বেশ বড় হয়েছে.তের বছর বয়স যে কেউ দেখলে প্রাপ্ত বয়স্ক মনে করে।মাতব্বরের কাছে কয়েকদিন আগে মেয়ের বিয়ের সমন্ধ এসেছে। মা কথাটা বলতেই বদর হাসতে থাকে। টুনি সেদিনের পুঁচকে একটা মেয়ে তার আবার বিয়ে।হাসতে হাসতে বাবার মতামত জানতে চায় ,মা বলল যে ,
ঃআমি কি জিগাইতে পারি?
মা বাবাকে খুব ভয় পায়, সে জানে,বদরের বাবার মতামত নেওয়ার এই বাড়িতে কেউ নেই .. একমাত্র বদরই পারবে তার মতামত নেয়া। কিন্ত বদর প্রায় পাঁচ বছর ধরে বাড়ি থাকে না, বাবার সাথে শেষ কবে কথা হয়েছে তা নিজেও জানে না।
বদরের বাড়ি বলতে এখুন রমাদের বাড়ি.মা বদরকে বলল,
ঃতুই হ্যারে জিগাইবি?
ঃকি যে বলো মা, ওর কি বিয়ের বয়স হইছে,আচ্ছা বাবা বাড়ি আসুক।
মায়ের মুখে শোনার পর টুনিকে এক নজর দেখল। টুনি তখন রোদে পাট শুকাইতেছিল।এরপর টুনির সামনে দাঁড়াতেই
ঃদাদা পাট বেচতে যাবা?
টুনির দিকে তাঁকাতেই দেখল যে, টুনি সত্যি বড় হয়ে গেছে। ওকে দেখে মনেই হয়না ওর বয়স তের।
ঃনা রে - এই তো এলাম
ঃরমা খুব সুন্দর -না দাদা
বদর বুঝতে পারল, টুনি বয়স অল্প হলেও, শারিরিক গঠনের সাথে সাথে বয়ঃসন্ধিকালে পা দিয়েছে।তাই তো শরীরের সাথে মনেরও পরিবর্তন ঘটে গেছে তার।
১৭
তাইতো রমা সম্পর্কিত কোন কথাই বলল না।
বদর এই কয়দিনে রমাদের কথা একবারও ভাবেনি। টুনির প্রশ্ন বদরের
মনের মধ্যে বারবার উদয় হইতেছিলো।হঠাৎ টুনি কেন এই প্রশ্ন করল আমায়। কিন্ত বদর অনেক ভেবেও নিজে এর সঠিক উত্তর খুজে পেল না।
রাতের খাবার শেষ করে ঘুমোতে যাবে। কে একজন বাড়ির বাহির থেকে মাতবর সাব মাতবর সাব বলে ডাকতেছে। এটা চর অন্চল সন্ধা বেলা গভীর রাত মনে হয়। একজন মাঝবয়সী লোক বলল,
ঃকইচা থেন আইছি, হাটে গেছিলাম। তুমি মাতবরের পোলা না?
ঃহ্যা-
ঃনারানবাবু হাটের মধ্যে কইছে, খবর দেয়নের কথা।জায়গিরদার যাইতে কইছে।রাইত মেলা অইছে আমি যাই গ্যা,,তোমার মায় কোনে, হ্যারে কইয়ো আমি কইচার চরে রহিমের পোলা।
লোকটা চলে যাবার পর মা বলল
ঃ কালই যাবি?
ঃনা,,
ঃতোর বাবায় আইলে যাবি?
ঃ বাবা আসুক তারপর ---
বদর বিছানার মধ্যে গড়াগড়ি করছিল কিন্তু ঘুম পাইতেছিল না।
ভাবতে ভাবতে রমাদির মায়ের কথা মনে হলো, রমার কথাও ভাবল,,
কিন্তু কিছুতেই মন সায় দিচ্ছিল না যে, রমাদের বাড়ি ফিরে যাবে।কেননা রমা আগের মত কথা বলে না। রমা কে নিয়ে বদর,,কত ঘুরতো,ঘুরি উড়াতো, বিলে শাপলা কুড়াতে নিয়ে যেত। মেলায় পুতুলের জন্য কত কান্নাকাটি করতো বদরের আজ সে সব খুব মনে পরতে লাগল।
ওদিকে বদর চলে যাবার পর থেকেই রমাদের বাড়ি একটা মরুভূমিতে পরিনত হয়েছে। মা প্রতিদিনই দু একবার করে রমাকে বদরের কথা বলে
রমা কোন কথা বলে না। বললেও মনটা ভার করে বসে থাকে।রমা আগের মত পড়াশোনা করছে না। মা ব্যাপারটা লক্ষ করছে।বাড়িতে রান্নাবান্না আগের মত হয় না।বাড়িতে দুজন মাত্র মানুষ, মা মেয়ে।বাঘিল বাজার থেকে মাঝে একবার পাশের বাড়ির ফনিন্দ্র কে দিয়ে বাজার করেছিল। আজ বাজারে না গেলেই নয়। রমার মা ভেবে পাইতেছিল না কি করবে।রমা পড়ার টেবিলে বসে পড়িতেছিল, মা দীর পায়ে হেটে রমার সামনে গিয়ে বলল,,,
১৮
ঃরমা- ঘরে তেল নুন নাই,বাজারে যেতে হয়।
ঃ মা আমি?
ঃবদর থাকলে তোকে বলতাম না।
ঃবদর দা কি আ--র
রমা কেঁদে ফেলল,একটা বোবা কাঁন্না, রমার চোঁখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পরলো। মায়ের মন রমার বোবা কাঁন্নায় রমার মা কেঁদে ফেলল,
ঘরখানি নিরব নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল। রমার ঠোট কাঁপছিল। মনে মনে কিছু একটা ভাবছে। মুখ থেকে বেরুল না। একটা হতাশা মনের মধ্যে বাসা বেঁধেছে।
রমার মা অনেকক্ষণ খাটের রেলিং ধর দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে কি ভাবিতেছিল বোঝা গেল না।রমা চেয়ারে বসেই আছে কিন্তু তখনও তার চোঁখে জল।মা এবার রেলিং ছেড়ে কিছুটা সাভাবিক হয়ে বলল,
ঃকাল তো হাটবার, কালকের দিন যাক
দেখি যদি না আসে--
ঃবিপিন দাকে খবর দেবে মা।
ঃনা,বিপেন কে খবর দিয়ে কি হবে।বিপেন বাড়ি ভুলে গেছে রে।
বিপিন গত এক বছর ধরে বাড়ির কোন খবর রাখে না। মা ছোটবোন রমা কেমন আছে কোন খোজখবরও নেইনি।
মা বেশ কিছুদিন হলোই বিপিনের কথা বাড়িতে বলতে দেয়না। বললেই রেগে যায় এইতো কয়েকমাস আগে সেদিন বাবা বাড়ি,বিপিনের কথা বাবা তুলে ছিলো। মা বাবাকে বলল,
ঃথাক,, ওর কথা শুনবো না ,ও আমাদের ডোবাবে।
সেদিন রমা মাকে জিজ্ঞেস করোছিল,দাদার কি সমস্যা। মা বাবা দুই জনেই সেদিন রমাকে একটাই কথা বলে যে,তুমি ভালবাবে পড়ালেখা কর। ওসব নিয়ে কখনো মাথা ঘামাবে না।
রমাও বাবা মার কথা অবাধ্য হওয়ার মেয়ে না। তাইতো আর কোন দিন
এবিষয়ে মাকে কোন প্রশ্ন করেনি।আজ রমা দাদার কথা বলল, কিন্তু রাগ না করলেও এটা বুঝতে পারল যে,দাদাকে ডাকলেও হয়তোবা দাদা বাড়ি ফিরবে না।তিথী আজ আবার আসলো। ঘরে যেয়েই দেখল যে মা মেয়ে উভয়েই কি যেন ভাবছে।বৌদি কে একবার ডাকলো, রমার মা তেমন কোন প্রতুততর করল না।রমাকে বলল,,
ঃ কি রে বোকা কা্ঁদিস কেন?
ঃবাজারে যেতে হবে কেউ নেই
১৯
ঃ কেন?,, বদর
ঃ এখনো আসেনি
ঃচল চল আমিই তোদের বাজার করিয়ে দিচ্ছি।বৌদি টাকা দাও।
রমার মা ঘরের কাঠের আলমারি থেকে টাকা বের করতে এগিয়ে গেল।
পীষি বলল ঃ রমা চল তো আমার সাথে,,কি কি আনতে হবে মাকে জিজ্ঞেস দকর পুর্নেদ্র এক সপ্তাহ পর আসতে বলেছিল। তিথী মুলত পুন্য-র কাছেই এসেছে। রমাকে আবার বলল,ঃতারাতারি কর রমা,,পুন্যর কাছেও যেতে হবে।বৌদি তিথীর হাতে বাজারের খালই( বাঁশ দিয়ে তৈরি ঝাকা) দিয়ে বলল,তেল নুন (লবন) কাচাবাজার, আর হলুদ।
ঃ বৌদি তেলের বোতল
রমা ও তিথী দুজনে বাজারের দিকে রওনা হল।তিথী প্রথমে পুন্যর বাড়যায়।
কিন্ত পুন্য আজও গয়নাটা দিলো না। কালকে আবার আসতে বলল,পুন্যর বাড়ি থেকে বেরিয়েই তিথী বলল,
ঃ কামার রা মানুষ ভালো না, এতদুর থেকে আসি গায়েই লাগে না। আমি কিছু বলিনা গ্রামের বাড়ির লোক।দাদা কবে আসবে রে?
ঃজানি না পীষি।
ঃকতদিন পরপর আসে
ঃবছরে এই ধর দুই তিন বার।দাদা (বিপিন) তো বছর ঘুরে গেল প্রায়।
পীষি আর কোন কথা বলল না। রমা বেশ বুঝতে পারল,দাদাকে সবাই এড়িয়ে যাচ্ছে। তিথি বলল,,
ঃ বাজারে এসে গেছি যেতে যেতে কথা হবে।
বাজার শেষ করে ফেরার পথে রমাকে বলল,ঃ রমারে বদর মনে হয় খুব রাগ করেছে তোদের উপর। না হলে এতদিন বাড়ি থাকার কথা না। তুই কি মনে করিস?
ঃ পীষি,মার কোন দোষ নেই।
ঃতুই কি করবি?
ঃ বুঝতে পারছি না।
ঃআমি বলি কি তুই বদরদের ওখানে যা।
ঃ তা কি করে সম্ভব, মা কি বলবে?
ঃ মাকে যদি আমি বলি
ঃঅনেকদুর কোন যাইনি, একবারই দাদা গিয়েছিল।
২০
ঃওদের কথা বললে যে কেউ দেখিয়ে দেবে।আর এখুন বন্যা,জল সরবর
মাঝিই নিয়ে যাবে।
ঃ মা বলছিল কাল হাটবার, এর মধ্যে যদি আসে।
ঃযদি না আসে,ঃ তারচেয়ে শুকলাকে (শকুন্তলা)তোর কাছে পাঠিয়ে দেই, দুইজনে মিলেই যা।
ঃ মা যদি রাজী না হয়
বাড়ি ফিরে তিথী বৌদির কাছে জানতে চায়। কিন্তু রমার মা তিথীর কোন উপদেশ শুনতে চাইল না। বরং এটা বলল যে, বদর কে নিয়ে তোমাকে কোন মাথা ঘামাতে হবে না।সংসারে কেউ একবার অবাধ্য হলে তার কথার কোন মুল্য থাকেনা
সুকুমার কে বিয়ে করার জন্য এবাড়িতে তিথির কোন মতামত গ্রহণ যোগ্য নয়।তিথী সবই জানে, তবুও রমা ও বৌদির বিষয়ে নিজের মতই ভেবে নিয়েছিল।কিন্তু যা হবার তাই হলো।তিথীর চোঁখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরতেছিল।আঁচল দিয়ে কোন রকম চোঁখ মুছতে মুছতে রমাকে বলল,
ঃআজ আসিরে রমা, আবার একদিন আসব!
রমা আস্তে করে ঘাড়টা বাম দিকে হেলালো, মুখে কোন কথা বলল না। তিথী চলে গেলেও রমা আনমনে অরেকক্ষন দাঁড়িয়ে রইল।এরপর মা এগিয়ে এসে রমাকে বলল,
ঃকি করব, তা নিয়ে তিথী বলার কে?তিথী এবাড়ির কেউ না,যেতে যদি হয় যাব, ওর কথায় না--
মাকে অনেকটা রাগান্বিত দেখাচ্ছিল। একবার ভাবল মাকে কিছু একটা
বলবে।
কিন্তু কিছুই বলা হলো না। মা বিরবির করতে করতে চলে গেল।
রমাও দৌড়ে গেল বদরের রুমে।দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল।আজকাল রমার এক আধটুক মন খারাপ হলেই বদরের রুমে যায়।ঘন্টা খানেক পর মা এসে রমাকে ডাকল,দরজা খুলেই বলল,
ঃমা কিছু কি বলবে?
ঃঠাকুর মশাইর ওখানে যাব তুমি বাড়িতে থেকো!
ঃআচ্ছা যাও
মা চলে যাবার পর রমাও ভাবতে লাগল যে, মা অনেকটা বদরের উপর নির্ভরশল হয়ে পরেছে। কিন্তু কি করা যা।শেষমেষ স্থির করল যে, আমি নিজেই আমার উপর কতক্ষন রাগ করে থাকতে পারবে তাহা সে নিজেও দেখতে চায়। কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা শঙ্কা বিরাজ করছিল যে লোকে কি বলবে।পাড়া পড়শীরাই বা কি বলবে।
২১
একটু পরেই মা ফিরল আর বলল,
ঃনারান বাবুকে পেলাম না। উনি নাকি শহরে গেছেন।কি আর করা।
ঃমা বলছিলাম কি তুমি গেলে হয়না
ঃকয়দিন পরই তো দূগগা পূজা তা কি করে সম্ভব।তোর বাবা আসার সময় হয়েছে, পূজায় বাইরে থাকে না।মায়ের সাথে এ নিয়ে আর কথা বাড়াল না, ইচ্ছে ছিলো মা যদি একবার বলতো যে তুই যা।তবে এতক্ষণ হয়তো রমা খুশিতে নাচতে শুরু করতো।
পরেরদিন রমা ঘুমেই ছিল, নারায়ন ঠাকুর কে আরো একবার জানাল যে,বদর তো এলো না ওর সামনে মেট্রিক।নারায়ন বাবু মাকে আশ্বত্ব করলো যে বিকেলে আরেকবার খবর পাঠাবেন। তার পর যা করার সে করবেন।
এদিকে ধলেশ্বরীতে জল বেড়েই চলছে। শিবপুর ঘাট থেকে নৌকা অনর্গল যাতায়াত করতেছে।আজ হাটবার নৌকা গুলো সব হাটের কিনারেই ভিরবে।
রমা স্কুলে যাইবার কিছুক্ষন পর, বাড়ির বাইরে থেকে একজন অপরিচিত লোক এসে বিপিনকে ডাকতে থাকে। রমার মা এগিয়ে যায়, লোকটাকে চিনতে না পেরে বলে যে,ঃবিপিন বাড়ি থাকে না, কোথা থেকে আসছেন আপনি?
ঃ মাতবরের বাড়ি থেনো!
ঃ বদরের বাবা পাঠাইছে আপনাকে।
ঃহ-হ-হ হ, মাল ছামানা দিছে।নায় (নৌকা)আছে।
ঃআপনি বসেন কচুয়ানকে খবর দিতেছি।
ঃবমু না, নায় পোলাডা একলা রইছে।
ঃবদর কবে আসবে জানেন?
ঃমাতবর আসম থে'ন কাইল আইছে।হেইডা কয়নাই।আমি নায় যাইগা--
লোকটা চলে গেল,কিন্ত বদর সম্পর্কে কিছুই জানা সম্ভব হলো না। কচুয়ানকে ডাকার জন্য তার বাড়ির দিকে পা বাড়াল।কচুয়ানের বাড়ি,বাড়ি থেকে অল্প একটু দুরে। রমাদের বাড়ি থেকে পাঁচ কিম্বা ছয়টা বাড়ি পর। কচুয়ান ঘোড়ার গাড়ীতে মালপত্র শহরে আনা নেওয়া করে।কচুয়ানকে বাড়ি পাওয়া গেল না,উনি ঘোড়াকে ঘাস খাওয়ানের জন্য মন্দিরের পাশে নিয়ে গেছে।মা উপায়ন্তর না পেয়ে স্কুলে হেড মাষ্টার মশাইর অফিসে চলে গেলেন।
মাষ্টার মশাইকে জানালেন যে রমাকে আজ ছুটি দিতে হয়। বদরদের বাড়ি থেকে চাল ডাল এসেছে, সেগুলো গোছাতে হবে। কথাটা শোনা মাত্রই বলল যে আপনি যান আমি রমাকে খবর পাঠাইতেছি।রমার মা মাষ্টার মশাইকে নমষ্কার জানিয়ে বিদায় নিল।
২২
মাষ্টার মশাই এরপর পিয়নকে পাঠালেন দশম শ্রেনির রমাকে ডেকে আনার জন্য ক্লাসে তখুন বিজ্ঞান পড়াইতেছিল। পিয়ন স্যারকে বলা মাত্রই-স্যার রমাকে বলল যে তোমার ছুটি,রমা জিজ্ঞেস করেও জানতে পারল না যে, কেন?। অবশেষে বাড়ির দিকে রওনা হল।বাড়িতে যেতেই মা বলল,
ঃকচুয়ান মন্দিরের পাশে আছে গিয়ে আমার কথা বল যে মা ডাকছে
ঃ তাঁকে দিয়ে কি হবে?
ঃ বদরের বাবায় মালপত্র পাঠাইছে।
ঃকোথায়?
ঃযুগনী হাটের বটতলা -নৌকায়, তারাতারি যা।
ঃ বদরদার খবর কিছু বলছে।
ঃনা-
ঃকবে আসবে বলেছে-
ঃ পরে শুনবি
মা ঘরের মাচা পরিষ্কার করতে গেল আর রমা চলে গেল মন্দিরের মাঠের দিকে।
বাড়ি থেকে কালী মন্দির দশ মিনিটের পথ। বাজারের শেষ মাথায়,যেতে যেতে রমা আনন্দে একা একা হাসতে লাগল।মনের অজান্তেই বলল,বদর তুমি চলে এসো,আমি তোমাকে খুব মিস করছি।কচুয়ান মালপত্র ঘোড়ার গাড়িতে করে এনে দিল। মা মেয়ে দুইজনে সারাদিন পরিস্রমে ক্লান্ত হয়ে পরে। রাতে খাবার খেয়েই মা ঘুমিয়ে পরলো।পরেরদিন খুব সকালে সয়া পাড়ার মাঝি বাড়ি থেকে গোপাল এসে উঠোনে দাঁড়িয়েই, রমা মা রমা মা বলে চিৎকার করছে,আর তখনই রমার ঘুম ভেংগে যায়। দরজা খুলতেই,
ঃতোমার মায় কোনে?
ঃকাকা বাবু ঘুমিয়ে আছে,এত সকাল আপনি?
রমার কথা শেষ হওয়ার আগেই মা দরজায় দাঁড়িয়েই
ঃগোপাল তুই এত সকালে?
ঃ দাদাবাবু আর নাই
রমার জ্যাঠাই সয়া পাড়ায়, মাঝি বাড়ি তার বাড়ি, রমার ছোট কাকা ও
জ্যাঠাই সেখানে বাস করে। রমার জন্মের পর তঁার বাবা বাঘিল বাড়ি কিনেছিল। জ্যাঠাই মাকে মেয়ের মত মনে করত।মা তাকেও শ্রদ্ধা করতো, তাইতো মারা যাবার কথা শুনতেই কেঁদে ফেললেন, রমা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।মা খুব জোরে জোরে কাঁদতেছিল, হঠাৎই বলল,,,ঃরমা আমাকে ধর।
বলা মাত্রই মা মাটিতে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল,
২৩
গোপাল দৌড়ে গেল ইন্দিরা খেকে জল তুলতে,রমা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল,আর বলল যে তোমরা কে কোথাও আছো আমার মা মরে গেল।আসে পাশের বাড়ি থেকে লোকজন ছুটে এসে দেখল, মা দরজার সামনে পরে আছে,গোপাল মাথায় জল ঢালছে।অনেকক্ষণ পর সুস্থ হলেও জরজর করে চোঁখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়িতেছিল।রমা খুব কাঁদছিল,পাশে দাঁড়িয়ে বিথী কাঁদছে। বিথীর মা সেখানে ছিল,।একজন জিজ্ঞেস করল, কিভাবে মারা গেল।
গোপাল জানাল যে, মাঝরাতে দরজা খুলতেই মাটিতে পরে যায় , কিছুক্ষণ গোঙ্গানোর আওয়াজ পাওয়া যায়, তার পরই দাদাবাবু সর্গবাস। লোকজন আহ্ আহ্ বলতেছিল।বিথীর মা বলল,ঃরমা তোরা তারাতারি যা দেরী করিস না।
বিথী বলল, ঃমা আমিও যাব
ঃআচছা!
বিথী দৌড়ে বাড়ি গেল, গায়ের পোষাক খুলে ভাইলেট কালারের সালোয়ারের সাথে সাদা কামিজ পরেই ফিরে এলো।রমা ও তার মা যে ভাবে ছিলো সেভাবেইরওনা হল। বিথীর কাঁদে ভর দিয়ে রমার মা এগুচ্ছিলো। নদীর পারে পৌছেই দুরে শস্মানঘাট দেখা যাইতেছিল।শস্মান ঘাট দেখেই রমার মা আবার চিৎকার করে কেদে ফেলল,ঘাটে অনেক লোকজন, তাহারা বলাবলি করতে ছিলো কি হয়েছে।পাটনী নৌকায় বসেই বলল,
ঃউনি রতন দা- র বৌদি, খগেন দা সর্গবাস!!!
রতন দা, রমার ছোট কাকা। পাটনীর বাড়িও মাঝি পাড়ায়, রতন দার বৌদি কে আগে থেকেই চেনা জানা।লোকজন দাহ্ কথা জিজ্ঞেস করতেই বলল যে,দুপুরের পরে ।পাটনী বৌদিকে ডাকল নৌকায় উঠে আসতে।বিথী ও রমা কাঁন্নারত অবস্থায় মাকে নৌকায় তুলল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ওপারে পৌছাল।এই ঘাটের নদীর প্রস্থ মাত্র পাঁচশ গজের মত। তবে নদিতে প্রচুর স্রোতের কারনেএকটু সময় লাগে কিন্ত চৈত্র মাসে নদীটা শুকিয়ে গেলে লোকজন হেটেই পার হয়ে থাকে।
সয়া স্কুলের গেটে পৌছতেই মা আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।স্কুল গেট থেকে একটু দুরে মাঝিবাড়ি,,সাথে সাথে হৈ চৈ পরে যায়।পাশের বাড়ি থেকে কে যেন জল ছিটিয়ে দিল, জ্ঞান ফিরতেই ধরাধরি করে নিয়ে গেলমাঝিবাড়ি।রতনদা চিৎকার করে কাঁদছিল।রমাও অনেকটা পাগলের মত কাঁদছে। এই বুঝি তার মা মারা যাবে।রতন কাকাকে জড়িয়ে ধরে রমা কাকা কাকা বলে চিৎকার করছে।
২৪
আশপাশের বাতাস ভারি হয়ে আাসে।
একটু পরেই নিকটাত্মীয়রা চলে আসল।কিন্ত বাবা ঢাকায় আছেন তার জন্য অপেক্ষা করা গেল না।
সকাল খেকেই চটি বই গীতা নিয়ে বয়স্করা পরিতেছিল।পুরুষেরা কেউ কেউ ঢোল খঞ্জর বাজাইয়া ভগমানের উদ্দেশ্য গান গাহিতেছিল।কিন্ত ততক্ষণে বাড়ির আংগিনার পুরাতন আমগাছ কেটে লোকজন টুকরো করা শেষ করেছে।ঠাকুর মশাই আসিয়া পরনের কাপড় সমেত কলা গাছের ভেলা (খাট) শব তুলিবার আগে একবার মন্ত্র পাঠ করিলেন। এবং জ্যোঠিমাকে ধরাধরি করিয়া পায়ের কাছে আনা হল।বাম পায়ে র কুনুই আংগুল দিয়ে সিথীর সিধুর মুছে দিয়েই লোকজন খাটিয়ায় শব তুলে ফেলল।
রতন দা চন্দন কাঠ, ঘি, তামা, সোনা, মাটির হাড়ি নিলেন।শস্মান ঘাট অবধি যেতে যেতে রাস্তায় খুচরো পয়সা ছিটানো হচ্ছে। লোকজন কীর্তন গাহিতেছিল।মাঝে মধ্যে সমস্বরে রাম নাম সাতে,রাম নাম সাতে বলতে লাগলেন।চিতায় উঠিয়ে,নাক, কান, চোখে তামা,সোনা ছোয়ালো,
ঘি দিয়ে শরীর মাখিয়ে দিয়েই রতনকে মুখে আগুন দিতে বলল,ঠাকুর মন্ত্র পড়তে লাগল
ওঁ কৃতবাতু দুষকৃতং কর্মং জানতা বাপ্য জানতা,মৃতুকাল বশং প্রাপ্য নরং পথঞচতমাগতম ধর্মাধর্ম সমাযুক্তং লোভমোহ সমাবুতম দহেয়ং সর্বগাত্রনি দিব্যান্ লোকান্ স্ গচছতু ”
মন্ত্র পড়া শেষ হতেই আগুন দাউ দাউ করে জলে উঠল।রমা ও বিথী পাশাপাসি চিতার নিকটেই দাঁড়িয়ে রইল।সকলেই তখন চিতার দিকে তাকিয়ে দাহ্ দেখছে। রমাদি পিছনের দিকে তাঁকাতেই দেখল, বদর তাহার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। রমাদি সেসময় বদরকে জরিয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বললঃ বদর দা-জ্যাঠাই,
বদর দাহ্ সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। একবারও বসার চেষ্টা টুকুও করল না। রমাদি বদরের বাম পাশে সারাক্ষণ কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে কিন্ত
বিথী ব্যাপারটা সহজ ভাবে মেনে নিতে পারছিল না। ভিতরে ভিতরে খুব রাগ পুষতেছিলে। বিথী একবার ভাবল যে, রমাকে কিছু একটা বলবে। কিন্তু বলার মত ভাষাও খুঁজে পাইতেছিল না।
২৫
অগত্যা চুপচাপ বদরের ডান পাশে কয়েক ঘন্টা নিঃচুপ দাঁড়িয়ে রইল।
দাহ্ শেষ করে ঠাকুর মন্ত্র পড়লো,
যং ত্বমগ্নে সমদহঃ তমূ নির্বাপয়া পুনঃ।কিয়াম্বু অত্র রোহতু পাকদুর্বা ব্যল্কশা।।
এবার পিন্ডি দান করার আদেশ দিলেন।নদীতেই সব ছাই, কাঠ কয়লা, ভাসিয়ে দোয়া হল। তারপর যে যার মতন ছুটে চলল বাড়ির দিকে। রতনকাকা রমাকে বলল,চল আমরাও যাই।রমা বদরের হাত তখনো ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।
বদর বললঃ রমা আমি কি বাড়ি যাব?
ঃ মা তো এখানে, মাঝিবাড়ি যেতে হবে।
রতন এগিয়ে এসে বলল,ঃবদর তুমিও চলো
বদর আস্তে করে রমাকে বলল,,ঃএবার হাতটা ছাড়ো।
ঃনা,,
কাকা আমার প্রচন্ড মাথা ধরেছে।আমি বদর দার সাথে হেটে আসি,তুমি বিথীকে সাথে নিয়ে যাও।বিথী নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না।রাগে ছটফট করতে ছিল কিন্তু উপায়ন্তর না পেয়ে রতনকে বলল,কাকা চলুন।রতন ও বিথী হেটে চলল।বদর কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে রমাকে বলল,,
ঃএত শরীর খারাপ এতক্ষন বলোনি কেন?
ঃতুমি জিজ্ঞাসা তো করনি,দেখলাম মন দিয়ে চিতার দিকে তাঁকিয়ে
ঃ কখনো পোঁড়াতে দেখিনি, আজই প্রথম,মা আমার কথা কিছু বলেছে।
ঃচলুন হাটতে হাটতে কথা বলি
ঃচলো
ঃ মাথাতো ধরে রাখতে পারছি না, কাকা তো অনেক দুর চলে গেছে, এখান থেকে দেখাই যাইতেছে না।
ঃ কি করতে পারি আমি
ঃ আমাকে শক্ত করে ধরুন
ঃসেটা কি করে সম্ভব, তুমিই আমায় ধরে থাকো।
ঃহাটতে পারবে-- ঘাট অবধি চল
রমার সত্যিই মাথা ব্যথা করছে। বদরকে কোন ভাবেই বোঝাতে পারছে না যে, সে আর হেটে যেতে পারবে না।রমাদি এতক্ষন বদরের কাঁধে হাত রেখে হাটতে ছিল।
২৬
কিন্তু এবার হাতটা ফঁসকে মাটিতে ঢলে পরল।বদর বুঝতে পারল,এখনই রমার জন্য কিছু একটা করতে হবে। প্রায় সন্ধা ঘনিয়ে অাসতে ছিল। এখানে বেশীক্ষন থাকাও সম্ভব না।তাইতো বদর রমাকে মাটি থেকে টেনে তুলে জাপটে ধরে দাড় করানোর চেষ্টা করতে করতে জিজ্ঞাসা করল,ঃরমা তুমি ঠিক আছো? রমা- রমা
রমা কথা বলার চেষ্টা করছে, কিন্ত বদর দেখল যে এভাবে দাড় করিয়ে রাখা যাবে না।তাইতো রমাকে,দুহাত দিয়ে পাজাকোল করে তুলেই, জোরে জোরে পা ফেলতে লাগল।বদর মাঝি বাড়ি কখনও যায়নি।
কিন্তু সে জানে সয়া স্কুলের পাশেই মাঝিবাড়ি। তখন সন্ধে ক্রমশই ঘনিয়ে আসছে। প্রায় মিনিট দশেক পরে খেয়া ঘাটের কাছাকাছি পৌছাল। রমাকে জিজ্ঞেস করল যেঃতুমি এক মিনিট দাঁড়াতে পারবে? রমাকে মাটিতে দাড় করিয়ে বলল
ঃ আমাকে শক্ত করে ধরবে
ঃ আমি হাটতে পারব
রমার শরীরের পোষাক, পরে যাবার ফলে এখনও ধুলোবালি লেগে আছে।
বদর হাত দিয়ে ধুলো জেড়ে দিল। রমাদি বদরকে জরিয়ে ধরে আস্তে আস্তে হাটতে লাগল।এটা একটা অজো পাড়াগাঁ সন্ধার পর সাধারনত রাস্তাঘাটে লোকজন খুব একটা থাকে না। তাইতো রমা ও বদরকে পরিচিত কেউ দেখতে পেল না।সয়া স্কুল এর কাছাকাছি পৌছতেই বদর রমাকে বলল যে তুমি একলা হাটতে চেষ্টা কর, কিন্তু রমা বলল যে, না তোমাকে ধরেই হাটব।মাঝিপাড়ার লোকজন দুই চারজন ব্যাপারটা দেখল,কিন্তু কেউ কিছু বলল না। মা বিথীর মুখে শুনেছিল যে,বদর দাহ্ র সময় এসেছে, কথাটা শুনেই বিথীকে আর কিছু বলেনি।তবে ভিতরে ভিতরে খুব খুশি হইয়াছিল।
বদরের নাম শুনতেই রতনদের বাড়ির লোকজন ও নিকটআত্বিয়রা বদরকে নিয়ে আলোচনা করিতে লাগিল।কেউ কেউ বদর কে এক নজর দেখার জন্য তর সইছিল না।বদর, রতনকাকার বাড়ি গিয়েই দেখল, উঠোনে অনেক লোকজন। পীষি রমাকে বুকে জরিয়ে ধরেই,,ঃওমা তোর গায়ে তো প্রচন্ড জ্বর।বৌদি দেখ দেখ গা গতর পুড়ে যাইতেছে।
রমার মা কপালে হাত দিয়ে একবার দেখেই বলল,
ঃরমাকে রতনের ঘরে শুইয়ে দে।
ঃবদর এতদিন এলে না কেন? পীষি বলতেই, মা বলল যে বাড়িতে কাজ ছিলো?বদর তুমি বস এখানে।
২৭
উঠোনে মাদুর পাতা ছিলো সেখানেই বসল।
পীষি বুঝতে পারল যে, বৌদি কিছু একটা লুকাইতেছে। রমাকে কোন রকম ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হল।উঠোনে মোমবাতি আগে থেকেই জ্বলতেছিল। লোকজন সবাই বদরকে দেখতেছিল হঠাৎ একজন বলেই ফেললেন,
ঃতুমি দেখতে খুব সুন্দর, মন দিয়ে পড়ালেখা কর, তাইজ্জা হইয়ো না---
বাবার কথা বলতেই বদরের মুখটা মলিন হয়ে গেল। মনে মনে খুব রাগ হইতেছিল,কেননা বাবা ডাকাত হতে পারে কিন্ত তার মত মানুষ ৎ না।
মা বলল,
ঃবদরের বাবাকে আপনি চেনেন? আমরা জানি সে কেমন,,তাকে নিয়ে একটা কথাও বলবেন না। বদর এখানে বসার দরকার নেই,,রতন-- রতন--- এই রতন, বদরকে ওঘরে নিয়ে যা---ঃ মা-বাবা তো ডাকাতই
রমার শরীরের অবস্থা রাতে আরো খারাপ হয়ে যায়। প্রচন্ড জ্বর আর মাথাব্যথায় কাতরাচ্ছিল। ডা,যোগমোহনের কাছ থেকে ঔষধ আনিয়েও কোন পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেল না।মা ও পীষি হাতে পায়ে তেল মেখে সেবা করতে লাগল।শেষরাতের দিকে রমা ঘুমিয়ে গেল। মা ও পীষি চলে যায় বড়দার ঘরে।বদর ঘরের এক কোনায় সারারাত দাঁড়িয়ে রইল। মুখে একফোঁটা জলও দিল না।খুব ভোরে বদর হাত মুখ দুয়ে স্নান করিতে লাগিল। বিথী সন্ধে বেলায়ই ঘুমিয়ে পরেছিল। রমার রাতের পরিস্থিতি সম্পর্কে তার কোন ধারনা ছিল না। বিথী বদরের দিকে এগিয়ে আসতেই বলল,ঃবিথি এ দিকে এসো না, গায়ে কাপড় নেই।
ঃ আমার যে লজ্জা নাই হা-হা-হা,,,
ঃ আমার আছে, আমি কিন্তু সবাই কে ডাকব।
ঃ রমার কাছে যাও ও রতন কাকার ঘরে আছে।
বদর ইন্দিরা থেকে জল তুলে স্নান করতেছিল। পরনে শুধুমাত্র একটি গামছা পেচানো ছিল। বাড়ির সমস্ত লোক তখুন ঘুমিয়ে,রতন কাকার রুমের দিকে তাঁকাতেই দেখল মা দরজা খুলতেছেন, মাকে দেখেই বিথীরতনকার ঘরে চলে গেল।
বিথী দেখল যে, রমা ঘুমিয়ে আছে তবে শরীরটা গরম। মাথায় হাত দিতেই রমা চোঁখ তুলে তাঁকাল।রমার চোঁখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরতেছিল।বিথী কোন কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
এর একটু পরেি মা ঘরে এলো। ঘরে এসেই মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন।
বিথীকে বলল,হাত মুখ দুয়ে পরিষ্কার হতে। বদর স্নান সেরে ঘরে ঢুকেই বলল,
২৮
ঃমা আপনি স্নান করে নিন।
আমি রমাকে দেখতেছি
মা কোন কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মা চলে যাবার পর রমাকে বলল,ঃ তোমার খুব খারাপ লাগছে?
রমা, বদর কে ঘাড় ঘুরিয়ে বোঝাল যে,তার পাশে বসতে।বদর রমার মাথার কাছে বসতেই একটা চাপা কাঁন্না কেঁদেই বদরের ডান হাত খানি ধরে বলল,
ঃআমি খুব অন্যায় করেছি, বদর দা,তুমি আমাদের ছেড়ে কি করে থাকলে।
বদর কোন কথা বলছে না, নিঃচুপ রমার দিকে তাঁকিয়ে আছে।
ঃমা খুব কেঁদেছে জানো।পীষি কে, যা মুখে আসে তাই বলেছে।
ঃপরে শুনবো আমার বডড খিদে পেয়েছে।
ঃমা এলে বলতেছি।বদর দা,-ব-দ-র -দা
ঃ হু বলো
ঃআমি কি মাটিতে পরে গিয়েছিলাম।
ঃ হু
ঃতারপর
ঃ তারপর আবার কি
কথাশেষ হবার আগেই রতনকাকা ঘরে এলো।রমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
ঃ বিপিন তো এলো না, বিপিন শেষ মেশ এটা করবে ভাবতে পারি নি।
জ্যাঠাই এর মৃত্যুতে পরিবাারে মাছ মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ।সকালে ফলমূল দেওয়া হল, কিন্তু বদর এই পরিবেশে অভ্যস্ত নয়। তাছাড়া প্রায় চব্বিশ ঘন্টা হলো সে উপোস রয়েছে।রমাকে জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল যে, স্রাদ্ধর আগ পর্যন্ত এভাবেই চলবে। তাইতো রমাদি বদরকে বলল,
ঃ বদর দা তুমি এটা মানতে পারবে?
ঃকেন পারব না,আমি তো রোজার সময় সারাদিনই উপোষ থাকি।
ঃ মাকে কিন্তু বলো না। ঃহু
দুপুরের পুর্বেই রমা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেল। রতন টাউন থেকে ফিরতেই রমা এগিয়ে গেল,
ঃকাকা-- বাবাকে পেলে?ঃকথা তো হলো কাল আসতেছে।
রতন টাউন থেকে ওয়ার্লেস এর মাধ্যমে রমার বাবার সাথে যোগাযোগ করে থাকে।রতনকাকা বাড়িতে জানাতেই মা বদরকে ডাকল,রমাও বদরের সাথে এলো,মা বলল,
ঃআমরা বিকেলেই যাব, বিথী কোথায় গেল, তুমি হাটা চলা করতে থাকো।
ঃএকা হাটতে পারছি না মা।
ঃচেষ্টা কর
বিথী এই মেয়েটা একটু অন্যমনস্ক, এখানে এসেও সে স্থির না।
২৯
সকাল থেকেই মাঝিপড়ার এ বাড়ি ওবাড়ি টো টো করে ঘুরছে।বদরকে মা বলল যে, তাকে খুঁজে বের করতে।বদর খুঁজতে বেরিয়েই দেখল যে,বিথী কালী মন্দিরে একা দাঁড়িয়ে আছে।বদর কে দেখেই বিথী মন্দির থেকে বেরিয়ে এলো।ঃএখন দুপুর বেলা মা তোমাকে
ঃবদর দা- এটা জাগ্রত কালী জানো?
ঃজাগ্রত!
ঃহ্যা
ঃতুমি চাইতে পারো
ঃকি?
ঃআমাকে
ঃকি তোমাকে?
ঃঠাকুরকে বলো,ঠাকুর আমি বিথী কে চাই
ঃ বিথী! তুমি পাগল হয়ে গেছ।তোমার জন্য আমি পালিয়ে বেরাচ্ছি,
মা এবং রমার নিকট থেকেও।
ঃআমার কথা বলবেনা তো---ঠাকুরকে রমাদির কথা বলো।
ঃ তোমার সাখে কথাই বলতে ইচছে করছে নামা তোমায় ডাকছে আমি চললাম।
বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় মা খুব করে কাঁদছিল। পীষিও চোখে জল ধরে রাখতে পারছিল না। বদর মাকে জরিয়ে ধরে হাটতে ছিল। রমা বদরের বাম পাশের সার্ট ধরে হাটতে থাকল। বিথী বদরের পিছনে পিছনে হেটে চলল।খেয়া পারে মা আবার বসে পরল।রমাকে বলল,
ঃতর জ্যাঠাই আমাকে মেয়ে ভাবতো তোর বাবা, খুব অভিমান তার।
ঃ মা চলো- বাড়িতে গিয়ে শুনবো।
বদর রমাকে বলল,ঃ রমা তুমি নৌকায় উঠো--আমি মাকে তুলতেছি
রমা ও বিথী নৌকায় ঊঠার পর বদর মায়ের হাতটা ধরে টেনে তুললেন। খেয়া পার হয়ে হাটতে হাটতে মা বদর কে বলল,ঃ তোমার মা কেমন আছে?
ঃ ভালই আছে তবে টুনিকে বাবা বিয়ে দিতে চায়।
মা-ও-খুব ছোট। বাবার বোঝাতে পারবে তেমন কেউ নেই।
রমা মাঝ খানে কথা থামিয়ে দিয়ে বলল,
ঃ ওর কত বয়স?
ঃ তের বছর
ঃকি!
৩০
রমার বাবা বাড়ি ফিরলেন। ঠাকুরকে ডেকে শ্রাদ্ধ এর দিন তারিখ নির্নয় করে জানা গেল যে মহালয়ার দিন এটা করতে হবে।সে মোতাবেকই শুরু হলো কাজকর্ম।দাদাব শ্রাদ্ধ্ ও দূর্গাপূজার জন্য তিনি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এসেছেন।বাবা বাড়ি ফিরতেই রমা ও বদর পড়াশোনায় বেশ মনঃযোগী হলেনএদিকে দূর্গাপূজার আয়োজনের জন্য সমাজ প্রতিরা চতুরদিকে চাদা তোলা নিয়ে ব্যাস্ত।মহালয়ার আর একদিন বাকি রতন ও বাবা কেনাকাটা সারলেন।
সর্বপিতৃ অমাবস্যা দিবসে তিথির নিয়মের বাইরে সকল পূর্বপুরুষেরই শ্রাদ্ধ করা হয়। এই দিন গয়ায় শ্রাদ্ধ করলে তা বিশেষ ফলপ্রসূ হয়। উল্লেখ্য, গয়ায় সমগ্র পিতৃপক্ষ জুড়ে মেলা চলে।বাংলায় মহালয়ার দিন দুর্গাপূজার সূচনা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিন দেবী দুর্গামর্ত্যলোকে আবির্ভূতা হন। মহালয়ার দিন অতি প্রত্যুষেচণ্ডীপাঠ করার রীতি রয়েছে।
সে মোতাবেক রমার বাবাকেমহালয়ার দিন দিপ্রহরে নদীতে স্নান করিয়ে দাদার শ্রাদ্ধ শুরু করালেন।শ্রাদ্ধকর্তাকে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে ধুতি পরে শ্রাদ্ধ করতে হয়। শ্রাদ্ধের পূর্বে তিনি কুশাঙ্গুরীয় (কুশ ঘাসের আঙটি) ধারণ করেন।
এরপর সেই আঙটিতে পূর্বপুরুষদের আবাহন করা হয়। শ্রাদ্ধ খালি গায়ে করতে হয়, কারণ শ্রাদ্ধ চলাকালীন যজ্ঞোপবীতের অবস্থান বারংবার পরিবর্তন করতে হয়।
শ্রাদ্ধের সময় সিদ্ধ অন্ন ও ময়দা ঘি ও তিল দিয়ে মাখিয়ে পিণ্ডের আকারে উৎসর্গ করা হয়। একে পিণ্ডদান বলে। এরপর
দুর্বাঘাস, শালগ্রাম শিলা বা স্বর্ণমূর্তিতে বিষ্ণু এবং যমের পূজা করা হয়। এরপর পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে খাদ্য প্রদান করা হয়। এই খাদ্য সাধারণত ছাদে রেখে আসা হয়। যদি কোনো কাক এসে সেই খাদ্য খেয়ে যায়, তাহলে ধরা হয় যে খাদ্য পিতৃগণ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে।
মনে করা হয়, পাখিটি আসলে যম বা পিতৃগণের আত্মার প্রতিনিধি।গোরু ও কুকুরদেরও খাওয়ানো হয়। ব্রাহ্মণদের ভোজন করানো হয়। পূর্বপুরুষ (কাকের বেশে) এবং ব্রাহ্মণেরা ভোজন করলেই তবে পরিবারের সদস্যরা অন্নগ্রহণ করেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন