০১
গ্রামের নাম বারবয়লা। এই গ্রামেই বেড়ে ওঠা দুরন্ত এক কিশোরের নাম বদর আলী। গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিক শেষে ভর্তি হল,টাংগাইল জেলায় অবস্থিত বাঘিল কে কে উচ্চ বিদ্যালয়। কিন্ত বিদ্যালয়টি নির্মানের পর থেকেই অধ্যবধি সমস্ত ছাত্রছাত্রীই হিন্দু ধর্মালম্বী। কারণ,অনেক বছর আগে এখানে একবার হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা হয়েছিল। ফলে ঐসময় গ্রামের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য হিন্দুগণ ও মুসলমানগণ নির্মান করেছিল আলাদা আলাদা স্কুল।
যেহেতু বিদ্যালয়টি হিন্দু ছেলেমেয়েদর জন্য, ফলে বদরের জন্যও পাঠ্যে তালিকায় রয়ে গেল হিন্দুধর্ম শিক্ষা। ধর্মপাঠ্যে, দেব দেবীর কথা বলা হয়,কিন্ত বদর বুঝতে পারে না দেবদেবীই বা কি?পন্ডিত মশাই শ্রেণিতেই বা কি পড়ায়।কারো নিকটও জিজ্ঞাসা করার মত সাহস পায় না। কেননা, বদর জানে,সে একজন মুসলমান। আর মুসলমানের সাথে কথা বলা বারণ করেছে এস্কুলের প্রতিটি ছাত্র ছাত্রীর বাবা মা।
শ্রেণি ও বিদ্যালয়টিতে একা এক কেটে যায় বেশ কয়েকদিন ।কিন্ত তাঁর ইহা মোটেও ভাল লাগে না । এই কিশোর ছেলেটির একাকীত্ব, নিজেকে মোটেও মানিয়ে নিতে পারছে না। সে মনে মনে ভাবে, বাড়ী গিয়ে বাবাকে সবকিছু খুলে বললে কেমন হয়।অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল,পরেরদিন বইখাতা ফেলে ছুটে চলল বাড়ির দিকে।বদরকে ঊঠোনে দেখেই মায়ের কাঁন্না আর ধরে রাখতে পারলো না। মা দু'হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে, কাঁদতে কাঁদতে বলল,
ঃ কি কইরা আইলি এ-পথ--- --এই টুনি দ্যাখ তর দাদা আইছে।
বদর ফ্যালফ্যাল করে তাঁকিয়ে রইল মায়ের দিকে, চোঁখে জল টলমল করিতেছিল।কিন্ত,মাকে কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চলে গেল তাঁর থাকার সেই পুরোনো রুমে।বদর অনেকটা পথ পায়ে হেটে ক্লান্ত হয়ে ছিল।তাই সে'রাত্রে বাবার সাথে দেখা না করেই তারাতারি ঘুমিয়ে পরলো।সকালে ঘুম থেকে উঠেই ছুটে যায় নদীর দ্বারে, দুপুরের দিকে বাড়ি এলো। কিন্ত খাওয়াা দাওয়া যেন একেবারেই ভূলে গিয়েছিল ।
দুই,তিনদিন অতিবাহিত হইবার পর দেখল,আজ রাতে বাবা খুব তারাতারীই বাড়ী ফিরে এসেছে।সাধারনত এসময় তিনি বাড়ি ফেরে না। খাবার খাওয়ার জন্য খেজুরপাতার মাদুরে বসতেই বাবা বলল,
০২
ঃনদীর পাড়ে বইসা থাকস ক্যান?কে'র সাথে কথা কস না, জায়গীরদার তরে কিছু কইছে?খায়োন দেয় ঠিকমতো?তরে কি কিছু কয়?
বদর চুপচাপ ভাত খাইতেছিল,
ঃকাইন্ছার বাচ্চা আমার পোলাডারে দেইহা রাহে না, ওর কল্লা ডা নামায়া দিমু
কাইন্ছা,ভাল নাম কাশেম, তিনি জায়গীরদার। বদর বুঝতে পারলো এখন বাবার সাথে কথা বলা যাবে না। কারন বাবা ভীষন রেগে আছে।তাইজুদ্দিন অল্প শিক্ষিত একজন মানুষ, কিন্তু যেমন উদার ঠিক তেমনি তিনি কঠোর।
প্রায় সাত ফুট উচ্চতার সুঠাম দেহের অধিকারী এই কালো মানুষটা আসলে একজন দস্যুসর্দার।তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলবে এরকম মানূষ দশক্রোশ এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া কঠিন।
ঠিক, এরকম একটা ভয়ভীতির জন্য হিন্দু স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দিতে বাধ্য হয়েছে, শিক্ষক ও কমিটিবৃন্দ। গোঁরা হিন্দু সমাজের চাপে প্রধান শিক্ষক মহোদয় প্রথমে কয়েকদিন স্কুলে অনুপস্থিত থেকেছেন।সমাজের নিম্ন আয়ের মানূষ গুলোও এই অবিচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে ঊঠেছিলো।পন্ডিত মহোদয় মুখে কুলুপ সেটে বসে আছেন, তার আর কি-বা করার আছে।হঠাৎ-ই স্কুলে এ বদরের অনুপস্থিতি, আর এই সুযোগে ছাত্ররা বলাবলি করিতেছিল , বদর পালিয়েছে।
বিপিনের ক্লাসমেট জয়রাম, বিপিনকে বললঃ বদর পালাইছে!
জয়রামের কথা বিপিন অতটা গুরুত্ব দিল না, বিপিন দশম শ্রেনীর ক্যাপটেন। ছাত্রও ভালো,প্রধান শিক্ষক বিপিনকে নিজের ছেলের মতই মনে করে। ছাত্রদের কোন বিষয় জানার প্রয়োজন হলে,বিপিনকেই জিজ্ঞেসা করে থাকে।বদর কে নিয়ে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকবৃন্দও আলোচনায় জড়িয়ে পরলো।
অঃক মাষ্টার জগৎ মিত্র বলল,
ঃআপনারা দেখবেন বদর আর স্কুলে আসবে না।
সুকুমার বাংলা পড়ান এই সুবাধে তিনিও বললেন
ঃ আপোদটা বিদায় হলেই ভাল।
তারপর পন্ডিত মশাই বলল,
ঃ জায়গীরদারের বাড়ি কিছুই বলে যায়নি, সকালে উঠেই বই খাতা ফেলে বাড়ি।ভগমান যা করেন মঙ্গলই করেন।
বদরের নাম এখন স্কুলসহ গ্রামের সকলের মুখে মুখে।
০৩
সকাল থেকেই স্কুলে বদরকে নিয়ে বলাবলি হচ্ছিল। ক্লাসে এখন মধ্য বিরতি,হাঁপাইতে হাঁপাইতে ছুটে এলো নারায়ন ঠাকুর।হেড মাষ্টার মশাই অফিস রুম থেকে বারান্দায় বের হইতেছিল। মুখোমুখি দুইজনেই নমস্কার বলল।কে আগে নমস্কার বলল তাহা বোঝা গেল না। ঠাকুর সাহেব চেয়ারে বসেই হেড মাষ্টার কে বললেন,
ঃ তাইজ্জার ছেলেটা নাকি স্কুলে নাই,কি জানি নাম ওর-----
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই অফিস কক্ষে প্রবেশ করলো অন্যান্য শিক্ষকগণ।
ঃনারায়ন বাবু, বিষয়টা আমি আজি শুনলাম।সকালে ছাত্ররা বলাবলি করিতেছিল!
ঃ তো আপনি কি সিদ্ধান্ত নিলেন?
অফিস কক্ষে শিক্ষকদের কারো মুখে কোন কথা নেই। হেডমাষ্টার মশাই বলল,
ঃআপনি যে টা ভাল মনে করেন
ঃ আমি তাইজ্জা কে ভয় পাই।তাইজ্জা যদি এখানে আসে -- আমি কিন্ত বলব-হেড মাষ্টার সব জানেন, আর আপনার যদি কিছু করার থাকে তবে করেন।আমি এর দ্বায়ভার নিতে পারব না--- নমস্কার।
নারায়ন ঠাকুর দেরি না করে চেয়ার ছেড়ে ঊঠলেন,দপ্তরি ততক্ষণে ঘন্টা বাজালো। খেলার মাঠ থেকে ছাত্ররা ক্লাসের দিকে চলে যাচ্ছে। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই খেলার মাঠ ফাঁকা হয়ে গেল।
ছেলেটা স্কুল ছেড়েছে, কেন পালিয়েছে তাহাও কারো জানা নাই। মাষ্টার মশাই কি করবেন তাহা ভেবে ঠিক করতে পারছিলেন না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন স্কুল ছুটির পর শিক্ষকদের নিয়ে একটা আলোচনায় বসবেন।
কথা মত ছুটির পর আলোচনাও হল। কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত স্থির হলো না। অবশেষে শিক্ষকগণ যে যার মত বাড়ি চলে গেল।
স্কুল ছুটি হয়েছে অনেকক্ষন হল। কিন্ত মাষ্টার মশাই চেয়ারে হেলান দিয়ে চোঁখ বন্ধ করে বসে আছেন। দপ্তরী বাহিরে বসে অপেক্ষা করছে কখন স্যার বের হবে।অবশেষে প্রতিক্ষার প্রহর কাটলো, মাষ্টার মশাই বের হলেন, দপ্তরী পাশে দাঁড়িয়ে অফিস কক্ষ তালা দিলেন, চাবি হাতে দিতেই দেখলেন , চোঁখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরিতেছে।দপ্তরী ভাবল কিছু একটা বলি, আবার ভাবল না থাক। তবু আগ বাড়িয়েই বলল,
ঃ বিপিনকে পাঠাবেন স্যার?ওর বোন রমা আর বদর, একই ক্লাসে পড়ে! বিপিনকে ডেকে আনবো?বিপিনের ছোট বোন রমা একটু ব্যতিক্রমী,
০৪
কিন্ত ও বদরের সাথে কথা বলে।হেড মাষ্টার কি যেন ভাবল, তার পরই বলল,
ঃযাও ডেকে নিয়ে আসো!
বিপিনকে ডাকার জন্য নিলু চলে গেল। মাষ্টার মশাই স্কুল বারান্দায় পা- চারি করছে। যেহেতু স্কুল এর পাশেই বিপিনদের বাড়ি, সেহেতু খুব বেশী দেরী হল না বিপিনকে ডেকে আনতে। বিপিন, স্যারের সামনে দাঁড়িয়েই নমস্কার জানালো---ঃবদরের বাড়ি চেন?
ঃ স্যার, শুনেছি মাইল দশেক পশ্চিমে।
ঃতুমি কাল সকালে একটু যেতে পারবে?
ঃ আমি তো বাড়ি চিনি না?
ঃযে কাউকে বললেই দেখিয়ে দেবে, বলবে হেড মাষ্টার পাঠিয়েছে!
তাহলে বিপিন, এই কথা রইল--
তাইজুদ্দিন সাহেব দুপুরের ঠিক পূর্ব মুহুর্তে বাড়ির উঠোনে হেলানো চেয়ারে বসে রোদ পোহাইতে ছিল।এমন সময় বাড়ির সামনে গিয়ে বিপিন একজন মাঝবয়সী মহিলাকে জিজ্ঞেস করল,
ঃএটাই কি বদর,তাইজ্জার বাড়ি?
বাড়ির ভিতর থেকে মাতবর সাব বললেন,
ঃ ক্যাডা খোঁজে,এইডাই মাতবরের বাড়ি,ভিতরে আহো!
বিপিন উঠোনে পা দিতেই মাতবর দেখলেন,ছেলেটা বদরের চেয়ে বয়সে একটু বড়।ধুতি পাঞ্জাবি আর পায়ে স্যান্ডেল পরে দাঁড়িয়েই বলল,
ঃ বদর আছে? হেড মাষ্টার সাব পাঠিয়েছে--
ঃতোমাকে-তো চিনবার পারলাম না,
ঃ আমি বিপিন কাকা বাবু, ঐ স্কুলে দশম শ্রেনির ছাত্র।
ঃএই টুনি--- --- একটা চেয়ার দে,আর বদররে ডাক!
টুনি বদরের ছোট বোন, বয়স আট বছর স্কুলে এখনও যায় নাই। এটা একটা চর এলাকা। গ্রামেই পাঠশালা আছে, কিন্তু এখানকার ছেলেমেয়েরা খুব একটা পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ নাই। মাইনর পাশ, ওটা কোনরকম ভাবে করলেই হল। বদরই এখানকার প্রথম ছাত্র, যিনি মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য বাইরে পড়ালেখা করতে গেছে। টুনি চেয়ার উঠোনে রেখে,দৌড়ে গেল নদীর দ্বারে।বিপিন চেয়ারে বসার আগেই জায়গীরদার (কাশেম)এসেই মাতবরের পা জরিয়ে কেঁদে ফেললেন,
০৫
ঃ মাতবর সাব আমার ভুল অইছে- মাইয়াডার অসুখ আছিল, ওর সাথে কথা কয়নের সময় পাই নাই।
মাতবর কোন কথা বলল না, একবার মাথা দিয়ে ইশারা করল যে, বিপিন যেন চেয়ারে বসে। বিপিন চেয়ারে বসে মাথা নিচু করে রইল। জায়গীরদারের কাঁন্না থামছেই না।তখন মাতবর বললেনঃ তর কাঁন্দা থামা--।
ঃহ বাবাজি, কথা কইবার চাইছি, তুমি এতপথ আসলা কি কইরা।
কথা শেষ না হতেই বদর এসেই বললঃআরে বিপিন দা-----
এরপর, বিপিনকে নিয়ে গেল বদরের রুমে
ঐদিন দুপুরে বদর ও বিপিন নদীতে স্নান করল। পুর্বে বিপিন কখনও নদীতে স্নান করে নাই। নদীর জলে স্নান করার আনন্দ বিপিন এই প্রথম অনুভব করল । গ্রামটা ছবির মতোই সুন্দর।দুপুরে খাবার খেতে বসে হতভম্ব হয়ে গেল।দেখল, বোয়াল মাছ, চিংড়ি,পাবদা,আইর মাছ সব রান্না করেছে তাঁর জন্য।খাবার শেষে বদরকে বলল,,
ঃ এত মাছ কিভাবে জোগার হল?
ঃ বাবা জলাদ্বার ,বুঝলেন বিপিন দা।
ঃকাকাবাবু কোথায়?
ঃ ঘোড়া সাজাইতেছে
ঃতার মানে?
ঃআমাদের দিয়ে আসবে, কিন্ত জায়গীরদারের বাড়ি ভাল লাগে না।
ঃতোমাদের ঘোড়া আছে?
ঃআছে মানে,অনেক গুলা ঘোড়া।
বদরের কথা শেষ হওয়ার আগেই, তিনটে ঘোড়াসহ ঘোড়সোয়ারি ঊঠোনে হাজির।
বদরের বাবা,একজন ঘোড়সোয়ারিকে বলল,,ঃতুই থাক,পোলাডারে আমিই দিয়া আহি।
এই টুনি,তর মায়রে পাঞ্জাবিডা দিবার ক,
বিপিন দেখল,নদীতে যত রকম মাছ পাওয়া যায়,সেই সমস্ত মাছ একটা ঘোড়ার পিঠে বাঁধল।এরপর, একটা ঘোড়ায় বিপিনকে উঠানো হল, আরেকটা তে বদরের বাবা একলাফে উঠে বসেই বলল।
ঃ বদর, তুই আমার এই খানে আয়।(বিপিন)বাবাজি শক্ত কইরা ধইরো।
আর কাইন্ছা তুই হাইট্যা যাবি।
০৬
বিপিন এই প্রথম ঘোড়ায় চড়েছে, প্রায় দশ মাইলের পথ। বিপিন চোঁখ বন্ধ ক'রে,সোয়ারিকে শক্ত করে ধরে রইল।আধ ঘন্টার মধ্যেই বিপিন দেখল, আমরা স্কুলের কাছাকাছি পৌছেছি।চলন্ত ঘোড়া থেকেই বদরের বাবা জিগাইলো,ঃ বাবাজি তোমাগো বাড়ি কোন যায়গা
ঃ কাকা বাবু স্কুলের পাশেই
ঠিক তার মিনিট দুয়েকের মধ্যেই বিপিনদের বাড়ির সামনেই ঘোড়া তিনটে দাঁড়িয়েই -চি-চি-চি- বলে স্বব্দ করল।
ঘোড়ার উচ্চস্বব্দে বাড়ির ভিতর থেকে বিপিনের মা ও রমা এগিয়ে এলো,
ঃ বিপেন তুই ওখানে কেন?
ঃ মা, উনি বদরের বাবা।
ঃ নামতে ক- বাড়ির মধ্যে নিয়া আয়।
বদরের বাবা ঘোড়ার উপর থেকেই বিপিনকে বলল,
ঃবাবাজি ওই মাইডা ক্যাডা
ঃ আমার বোন,বদরের সাথে পড়ে।
ঃএই মছল্লা,মাছ গুলা ভি,ত,রে দে!
তাইজুদ্দিন ঘোড়া থেকে নামলেন,কিন্ত ততক্ষনে স্কুল মাঠে শত শত লোক জমা হয়ে গেছে। কেউ কোন কথা বলছে না।
স্কুল এর হেড মাষ্টার ও সভাপতি নারায়ন ঠাকুর সামনে এসেই নমস্কার করলেন।এরপর মাষ্টার মশাই বিপিনদের বাড়ি নিয়ে গেল তাইজ্জাকে। সাধারনত মুসলমানদের এই গোঁরা সমাজে ঘরের মধ্য প্রবেশ করান না। কিন্তু নারায়ন ঠাকুর বিপিনদের থাকার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসতে দিলেন,
ঃ বিপিনের বাবায় ঢাকায় থাকে, অসুবিধা নাই। আপনে যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে।
ঃ আমি দেরি করুম না, অহনি যামু পোলাডারে দিয়াই যামু,ওই ডা হারামজাদা, ওর কল্লা-ডা কাডবার চাইছিলাম, পোলাডারে দেই হা রাহে নাই।
মাষ্টার মশাই বললঃ আমি দেখে রাখব চিন্তা করবেন না।
ঃ বিপেন বাবাজি,বদরে তোমার এই খাইনেই থা'ক?
তাইজ্জাকে লোকজন সিংহপুরুষ মনে করে । শোনা যায়,একবার আসাম প্রদেশের কোন একটা গ্রামের সমস্ত মালামাল লুট করেছিল এবং ঐদিন তিনি গ্রামের সমস্ত মা ও মেয়েদের পরনের কাপড় পর্যন্তও খুলে এনেছিল।
ঐ সময় কলকাতার উগ্রপন্থী হিন্দু পত্রিকা আনন্দ বাজার,তাইজ্জা ডাকাতের
লোমহর্ষক কাহিনী, পত্রিকাটিতে বেশ কয়েকদিন শিরোনাম করে।
০৭
সে'সময় পুরো ভারতবর্ষ কেঁপে উঠেছিল, পশ্চিমারাও তার নামে একাধিক মামলা থাকা সত্যেও ধরার সাহস পায়নি।তাইতো তার কথার অবাধ্য হওয়ার সাধ্য কারো নেই।তাইজুদ্দিন সাহেব কথাটা বলা মাত্রই,হেড মাষ্টার মশাই থ-মেরে গেল।
হেড মাষ্টার শিক্ষিত মানুষ, অথচ একজন ডাকাতেরর কথায় ফেঁসে গেলন।উপায়ান্তর না পেয়ে নারায়ন ঠাকুরের মুখের দিকে তাঁকালেন।
ঠাকুর মশাই দূর্ত ব্যাক্তি , তিনি তাঁকানো দেখেই বুঝতে পারলেন, কিছু একটা বলতে হবে। এবং চটজলদি বলেই ফেললেন,
ঃ আপনি যখন বলছেন তবে তাই হবে, বদর এখানেই থাকুক
ঃ বিপিন তুমার মায়রে ডাকো -আমার পোলাডা তোমগো কাছে থাকব!
বিপিন মায়ের কাছে যায়, তিনি সব কিছু বারান্দা থেকেই শুনতে ছিলো,রমারদির মা বুদ্ধিমতী মহিলা, সে জানে তাঁর এখন কিছুই করার নাই। যেহেতু ঠাকুর ও মাষ্টার মশাই কথা দিয়েছেন। তাইতো দরজার সামনে এগিয়ে বললেন,
ঃ বিপিনের বাবা তো ঢাকায়।
ঠাকুর মশাই বলল,
ঃ ওটা আমার উপরে ছেড়ে দিন,কোন অসুবিধে নাই। আজ থেকে আপনাগো সংসারে যা খরচ সব তাজ ভাইয়ের।তাহলে এই কথাই রইল বিপিনের মাও বদররে কিন্তু তোমার ছেলে মেয়ের মতই মানুষ করবা।তাজ ভাই খুব ভাল মানূষ।বছরে এক আধবার আইব কি না সন্দেহ ।
রমা মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, বদরের বাবা,রমাকে বলল,
ঃআহো তো মা আমার কাছে
রমা গিয়ে সামনে দাঁড়াল।
রমাদি বদরের বাবাকে দেখে ভয় পাইতেছিল।কিন্ত তাইজুদ্দিন ডাকাত অদ্ভুত এক কান্ড করলেন।তাহার গলায় একটা দরির মত সোনার চেইন ছিল ।তাহা রমার গলায় পড়াতে লাগলেন। বদর অবাক হয়ে মনে মনে ভাবছে,বাবায় এই চেইনটা দিল কেন?বদরের বয়স চোদ্দ বছর, এখন অনেক কিছুই বুঝতে পারে কিন্তু এই ব্যাপারটা মোটেও বুঝতে পারলো না।এবার বিপিনের মা বলল,
ঃ এইটা কি করতেছেন?
নারায়ন ঠাকুর কথা শেষ হওয়ার আগেই বলল,
ঃ তাজ ভাইর মনটা অনেক বড়, তোমরা অমত কইরো না।
০৮
বদরের বাবা মাথায় হাত বুলিয়েই বলল,
ঃভাল কইরা পড়া লেহা করবা, তুমি যাও মা।মাষ্টার তাইলে আমি যাই গ্যা। কাম ফালায়া আইছি।
ঠাকুর বলল,ঃনা খেয়ে যেতে পারবেন না ভাই ।
ঃঠাকুর, আমি বাড়িতেই খাই, বাইরে খাই না।
বৌদি আমি যাইগ্যা, বদরে থাকল, আবার একদিন আসমু।
বিপিনের মা ঘাড় বাঁকিয়ে বিদায় দিলেন।
বাড়ির বাহিরে তখন গ্রামের শত শত লোক, হা করে দাঁড়িয়ে আছে। কখন
তাইজ্জা ডাকাত বের হয়, তার চেহারাটা এক নজর দেখবে বলে।
বাড়ির বাহিরে বের হয়েই একলাফে ঘোড়ার পিঠে চঢ়ে বসলেন, ঘোড়া চি-চি-চিং বলে লাফিয়ে চলল। দুই এক মিনিটের মধ্যে স্কুল মাঠ ফাঁকা হয়ে গেল।
বিপিনের মা অতিথি রুমে নিয়ে গেলেন বদরকে।
ঃএই রুমে থাকবা। পাশের রুম বিপিনের, কিছু দরকার হইলে আমাগো কইবা, আর আমি তোমার মাসী লাগী, মাসী কইবা। তোমার বাবা অত মাছ আমাগো জন্য আনছে?
ঃ জানি না (আস্তে করে বলল)
রমা সোনার মালা গলায় দিয়ে খুশিতে উঠোনে লাফাচ্ছিল। অত মোটা চেইন হয়, রমা সেটা জানতই না। একবার গলা থেকে খুলছে আর পরছে । মা বলল
ঃওটা দে হারাইয়া যাইব।
বলা মাত্রই রমাদি লক্ষী মেয়ের মত তাহা মায়ের হাতে দিল। দিয়েই বদরের দিকে এগিয়ে গেল। বদর রুমের মধ্যে প্রবেশ করতেই,ঃ বদর দা,তুমি গিয়েছিলে কেন? বাড়িওয়ালা কি খারাপ লোক?
ঃ না!------ঃতবে যে পালালে---তোমার বই কোথায়?
ঃ জায়গীরদার বাড়ি,
ঃবই আনবে না? ঃসব্ধে বেলা যাব।
ঃআমাকেও নিয়ে যাবে?ঃ বিপিন দা জানে
বদর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই রমাদের পরিবারে মিশে গেল। বদরের বাবা রমাদের পরিবারে চাল, ডাল, মাছ, সবজিসহ টাকা পয়সা পাঠাতে শুরু করল নিয়মিত।রমাদের পরিবার এখন বেশ সচ্ছল। রমার বাবা মাঝে একবার বাড়ি আসে।কিন্ত বদর সম্পর্কে সব কিছু জানার পর তিনিও আর অমত করলো না।
০৯
শুরু হল বদরের নতুন পথচলা। পায়জামা ছেড়ে, অন্য দশটা হিন্দু ছেলের মত সেও ধুতি পাঞ্জাবি পড়া শিখে যায়।স্কুলে নিয়মিত এই পোশাকই পরে।বিপিন রীতিনীতিও সব শিখিয়ে দিল।বিপিনের বোন রমা ও পাঠ্যে হিন্দুধর্ম শিক্ষা-র যেকোন বিষয় না বুঝলে, তা আলোচনার মাধ্যমে সহযোগীতা করতে থাকল।দিনের পর দিন চলতে থাকে এভাবেই
।আজকাল বদর, বিপিনের কাজ কর্মেও সহযোগীতা করতে থাকে। মা বদরের আচার ব্যাবহারে নিজেকে গর্বিত ভাবে।
শুরু থেকেই বিপিনের মাকে, বদর মা বলেই ডাকে।গোঁরা সমাজের লোকগুলোও তার আচার ব্যাবহারে সব কিছু ভুলে যায়।স্কুলেও শিক্ষক থেকে শুরু করে সবার প্রিয় পাত্রে পরিনত হতে থাকল এই ছেলেটি।প্রতিদিন বিকেলে বদর এখন স্কুল মাঠে ফুটবল খেলে হিন্দু ছেলেদের সাথে।
রমার বান্ধবী বিথী প্রায় প্রতিদিনই দুই একবার রমাদের বাড়িতে আসে। আজও বদর ফুটবল মাঠে খেলিতেছে, এই ফাঁকে বিথী বদরের রুমে যায়, গিয়েই রমাকে বলেঃএই রমা আমি বদরদার ঘরে।
রমা তখন ওদের বড় ঘরখানাতে ছিল, একদৌড়ে চলে আসে। এসেই দেখে বদরের রুমে বিথী শুয়ে আছে।ঃ বিথী তুই বদর দার বিছানায়!
ঃ বদর নাই তাই!
ঃ দাদা দেখলে বকবে!
ঃ দাদাও নাই হি-হি-হি—হি।
অনেকক্ষন হাসা হাসি করল দুজনে।এক পর্যায় বিথী বলল,
ঃবদরের বাবা,তোকে অনেক ভারি একটা মালা দিছে--তাই না?
ঃ ওটা মায়ের কাছে-যদি হারিয়ে যায়।
চল তোকে দে্খাব।দুজনে বদরের রুম থেকে বের হল, মা মা বলে ডাক ছাড়ল।তখন মা ঘর ঝার দিতেছিল, মায়ের কাছে গিয়ে বলতেই মা বলল,
ঃ আলমারিতে আছে এখন সাজ বেলা,আরেকদিন দেখাস।
রমার খুব মন খারাপ হলো, কিন্তু তেমন একটা জোর করল না। বিথীকে বলল,,ঃ কাল দেখবি এখন তো সন্ধেবেলা।
বিথী কোন কথা বলল না, বদর খেলা শেষ করে বাড়ি ফিরল, বদরকে দেখেই বিথী এক দৌড়ে বাড়ি চলে যায়।
বদর রুমে প্রবেশ করেই দেখল সবকিছু এলোমেলো ,রমাকে বলল
ঃ এই রুমে কেউ এসেছিল?
ঃ বদর দা---বিথী!
১০
দেখতে দেখতে এই বাড়িতে বদরের পাঁচ বছর কেটে গেল। বদর এই পাঁচ বছরে,নিজেকে কখনোই বাবা মায়ের অভাব বোধ করেনি। রমার মা বদরকে নিজের সন্তানের মত করেই লালন পালন করছে।বদরও কখনো তাদের অমর্যাদা করেনি।
এখন বিপিন বি,কম শেষ করে ঢাকায় চাকরীর পিছনে ছুটছে।বাড়িতেও খুব কম আসে।রমা ছোট থেকেই ভাল ছাত্রী, তার আশা বড় হয়ে ব্যারিস্টার হবে।সামনে মেট্রিকুলেশন পড়ালেখার প্রচুর চাপ, নিজের সম্পর্কে সব বুঝতে শিখেছে. বদরের সাথেও আজকাল খুব কম মেশে। বদর ওতটা ভাল ছাত্র না হলেও একেবারে খারাপ না।কিন্তু এ্যামভিশন নাই। তবে অনেক পড়াশোনা করবে এই এটুকুই আশা।
পাঁচ বছরে বদর হাত গোনা কয়েকবার মাত্র বাড়িতে গিয়েছিল। বাড়ির কথা এখন তেমন একটা তাঁর মনেই হয় না।বদর দেখতে এখন একজন সুদর্শন যুবকে পরিনত হয়েছে।, ক্লাসের মেয়েরা বদরের সাথে গায়ে পরে কথা বলে।রমার বান্ধবী বিথী বদরকে অনেকদিন ধরেই পছন্দ করে।বিথী জানে বদর মুসলমান,তবু একদিন টিফিনের ফাঁকে বদরের হাত জরিয়ে ধরে, বদরকে বলে যে, তাকে ভালবাসে। এরপর থেকে রমা ব্যাপার টা সহজ ভাবে মেনে নেয় না।এই নিয়ে রমা বিথী মনমালিন্য হয়।পরমুহুর্তে ক্লাসের সবাই এই কথা যেনেও যায়।
যেহেতু সবাই এখন বড় ক্লাস এ পড়ে, তাইতো সবাই এব্যাপারটা চেপে যায়।
সে দিন বদর কিছুতেই বুঝতে পারল না যে, কেন রমা এর জন্য বিথীকে অত অত খারাপ ভাষা ব্যাবহার করল।কারন রমা শুধু দেখতেই সুন্দর না় ওর ব্যাবহারও খুব ভাল। ও এত সুন্দর করে কথা বলে যে, শিক্ষকরাও তাহার প্রশংসা করে। অথচ আজ যেরকম ব্যবহার করল তা কেউ কল্পনা করতে পারেনি. বিথী রাগান্বিত হয়ে অবশ্য বলেছিল ,“বদর যদি চায় আমি মুসলমান হবো তাতে তোর কি?তুই ওকে পছন্দ করিস?
সে দিনের পর থেকেই রমা আর আগের মত মেশে না. বিথীর সাথেও কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে।বদর কিছু জিজ্ঞেসা করলেই বলে,
,সামনে পরিক্ষা, পরে বলবো, এখন পারব না, ঘর গোছাতে হবে. মায়ের সাথে রান্না চড়াবে ইত্যাদি ইত্যাদি বলতে থাকে। বিথীও আর এবাড়িতে আসে না. বদরেররও মন খারাপ হয়ে যায়। তাইতো কদিন ধরে সারাক্ষন ঘরে বসে থাকে। মা লক্ষ করছে যে, ইদানিং বদর তেমন একটা পড়াশোনা করছে না.
১১
সারাদিন শুধু ঘরের মধ্যেই শুয়ে থাকে।কিছু একটা বলবে ভাবে কিন্তু বলা হয়না।অবশেষে চিন্তা করল,রমাকে জিজ্ঞেসা করলে কেমন হয়.সংকোচন না করে রমা কে বলল,
ঃ বদরের কি হইছে জানোস?
ঃ জানি না!
ঃ ছেলেটা ঠিকমতো পড়াশোনা করতেছে না।
রমা এবিষয়ে কোন কথাই বলল না, মা রমাদির পড়ার টেবিলের পাশে অনেকক্ষন দাড়িয়ে রইল, রমার কোন প্রতুত্তর না পেয়ে ঘর থেকে বের হতে যাচ্ছিল। এমন সময় বদর আসল, মনে হচ্ছিলো রাতে ঘুমায়নি ছেলেটা।
চোখ দুটো লাল হয়ে আছে.এসেই বলল
ঃ মা আছেন, আমি বাড়ি যাব।
মা বলল, ঠিক আছে যেয়ো--সোজা রুমে এসেই ব্যাগটা গোছাতে থাকে।পরনের ধুতি একটানে খুলে ফেলল।পুরোনো একটা পায়জামা ছিল সেটাই পড়ল, পাঞ্জাবি গায়ে যেটা ছিল তাহাই রইল. জুতো জোড়া পাল্টানোর আর প্রয়োজন মনে করল না।রুম থেকে বের হতেই মা সামনে এসে দাড়ায়, রমা পড়ার টেবিল ছেড়ে দরজায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে,মা বলল,
ঃবদর কি হইছে তর.কবে ফিরবি, রমা এদিকে আয় বদর বাড়ি যাইতেছে।
রমা আসার আগেই বদর উঠোন ত্যাগ করল.মা বাহির দরজায় দাঁড়াল,পিছনে রমাও দাড়িয়ে,মা আবার বলল
ঃবদর কবে ফিরবি?
: ঃজানি না মা ---
জানিনা কথাটা বলতেই বদরের চোঁখ দিয়ে জল গড়িয়েে পড়ল। রমার মা একজন মাঝ বয়সী মহিলা, সে বুঝতে পারল যে নিষ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। তা না হলে বদর এভাবে চলে যাচ্ছে না.
ঃআসি মা
রমা কোন কথা বলল না, মা বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল. রমা একদৌড়ে বদরের রুমে গেল। বদর ততক্ষনে অনেকদুর চলে গেছে।
রমা রুমে গিয়ে ওর বিছানায় শুয়ে পরে, মুখটা বালিশে গুজে খুব করে কাঁদছে।রমা এই প্রথম বদরের বিছানায় মাথা ঠেকায়. রমার কি হয়েছে, রমা আজ নিজেই জানে না।কিন্তু খুব করে কাঁদছে এই ভেবে যে, বদর যদি আর কখনও না আসে। ইহাও ভাবিল যে, বদর হয়তো আমার উপর রাগ করেই চলে গেল।মনে মনে একবার বলেই ফেলল, বদর তুমি যেয়ো না.
১২
রমার মা ঘরে ফিরে রমাকে দেখতে না পেয়ে, অবশেষে বদরের রুমের দিকে পা বাড়াতেই দে্খল রমা বদরের বিছানায়
দেখেই অবাক হয়ে যায।এক নজর দেখেই না দেখার ভান করে চলে এলো়। মা এটুকু অনুমান করল যে, রমা হয়তো বদরকে কিছু বলেছে, আর সে জন্যই বদর বাড়ি চলে গেল।
অনেকক্ষন পর রমা বিছানা ছেড়ে , টেবিলে বসে বদরের বই খাতা মনের অজান্তে হাতরাচ্ছে। রমার আজ একটুও ভাল লাগছে না.
রাতে খাবর খেতে বসে মা দেখল রমা খাবার ঠিকমতো খাইতেছে না।কি যেন মনে মনে ভাবছে।রমার মা খুব বুদ্ধিমতী মহিলা, বদর আজ নেই,মায়ের মনও খুব খারাপ।কিন্ত কি করে রমাকে জিজ্ঞেস করবে ভেবে পাইতেছিল না।তাইতো একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলল ,
ঃমায়ের কথা মনে পরছিল মনে হয়.তরে কিছু একটা কইছে?
রমা মাথা নেড়ে বোঝাল যে, না।এবং একটা দীর্ঘনিশ্বাস নিল। রমা কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে, মায়ের সাথে কথা বলতে মন চাইছে না। কি বলবে মাকে. মাকে কি এটা বলা যায় যে,
মা, বদর আমার কারনেই----
সকালে ঘুম থেকে উঠেই রমা মন্দিরে গেল়. বাড়ির পাশেই কালী মন্দির, ঠাকুরের কাছে মনে মনে কি চাইল তা জানা গেল না. প্রনাম করে চোঁখের জল মুছতেই দেখল,তার পাশেই দাঁড়িয়ে ঠাকুরকে প্রনাম করছে বিথী।,মনে মনে খুব হিংসে হচ্ছিলো। পা বাড়াতেই বিথী বলল ,
ঃ বদর চলে গেছে-না?
ঃ তোর কারনেই
ঃ ঠাকুরের দিব্যি, ওকে না পেলেও
ঃ: কি করবি?
ঃতোকেও পেতে দেব না।
ঃ বিথী ও আমার দাদার মত
ঃ হ্যা, স-ব বুঝি,তোর সাখে কথা বলতেই মন চায় না.
বিথীর কাছ থেকে অপমানিত হয়ে ঘরে ফিরতেই মা বলল,
ঃ রাতে পড়লেখা করলি না,নে পড়তে বস.
মায়ের কথার কোন প্রকার জবাব না দিয়েই চলে গেল পড়ার টেবিলে।সারারাত ঘুমায়নি, বই খুলতেই চোঁখে ঝাপসা লাগছিল মা সবে রান্না শেষ করে ঘরে ফিরেছে,
১৩
এমন সময় রমার পীষি এসে উঠোনে দাঁড়াল, দাড়িয়েই বলল ,ঃ রমা -- রমা কোথায় রে--?
মা বললঃতিথি তুই এত সকালে ,,,?
ঃআর বলোনা বৌদি, তোমাগো বাঘিলে পূন্যদার কাছে, অনেকদিন হয়ে গেল গয়নাটা দেয়় না।
ঃবৌদি রমা কোথায়?
ঃ ঘরে চল সব বলছি ওপড়তেছে
ঃচলো চলো-- এই রমা
পীষি ঘরে গিয়ে রমার গলা জরিয়ে ধরল। কিন্তু রমা খুব করে কাঁদছে,
ঃআরে আরে বোকা মেয়ে কাঁদছিস ক্যান।তোর পীষি সবসময় তোদের সাথেই আছে।
পীষি মাথায় হাত বোলাতে লাগল, পীষির শশুর বাড়ি গালা ইউনিয়নে পাল বাড়ি, পালবাড়ির বড় ছেলে সুকুমার কেরানির চাকুরী করে, সচ্ছল একটা পরিবার হলেও সুকুমার কোনদিন এ বাড়িতে আসেনা। তিথি সুকুমার কে ভালবাসতো কিন্তু সুকুমার পাল বংশ এটা রমার বাবা মেনে নিতেই পারেনি আজ অবধি।শেষমেষ তিথি পালিয়ে সুকুমারদের বাড়ি যায় ,বিয়ে হয়েছে প্রায় শতেরো বছর ,এই সতেরো বছরে রমার বাবা একবারও দেখতে যায়নি। তিথির একটা মেয়ে আছে নাম শকুন্তলা, সবাই শুকলা নামে ডাকে।শুকলার বয়স পনেরো, গালা হাই স্কুলে পড়ালেখা করে।তিথি বছরে এক আধবার আসে। মা তিথিকে নিজের সন্তানের মতই মনে করে। মা জিগ্গেস করল,
ঃশুকলার শরীরটা ভালো আছে,? দেইখা রাখিস
মাথা নেড়ে বললঃ হ -
ঃসুকুমার আমাগো কথা কয়.
ঃওসব থাক বৌদি,আমি দেরি করব না , বদরকে তো দেখছি না বৌদি
ঃ গতকাল বাড়ি গেছে
ঃছেলেটা মুসলমান, কিন্তু খুব ভাল তাই না বৌদি.
ঃতিথি - রমাকে সাথে নিয়ে খাবি, তার পর যাস
মা ঘর থেকে বের হতেই তিথি রমাকে বলল,ঃবদর ছেলেটা এখন কেমন রে?
রমা শুধু মিটিমিটি হাসল।
তারপর, তিথির সাথে রমাও পুন্য কর্মকারের বাড়ি অবধি যায়।ফিরবার কালে রমাকে বলে যে,ঃবাড়িতে শুকলা একা, তুই কিছু বলবি?
ঃবদর,আমার উপর রাগ করেছে-
ঃ কেন রে? চল হাটতে হাটতে কথা বলি
১৪
ঃবিথী বদরকে ডিস্টার্ব করে
ঃ তুই কি করছিস
ঃআমি রাগ করে কথা বলি না.
ঃ মা জানে?
ঃ না
ঃ মাকে ব'লো না তুমি
ঃ কি করবি
ঃতুমি বলে দাও আমার কি করা উচিত
ঃও আসলে ক্ষমা চাইবি, ও তোর বড়-দার মতন
ঃ আর যদি কখুনো না আসে?
ঃআসবে রে আসবে, অনেকদিন হলো আছে, মানুষ সব কিছু ভুলে যায় না
কয়দিন পর আবার আসতেছি,গয়নার জন্য, এই কয়টা দিন দেখ,
ঃপীষি---মাকে কিন্তু বলো না
ঃ আচ্ছা বাবা তুই যা--- যা স্কুলের সময় হয়ে গেল।
রমা বাড়ি ফিরতেই মা বলল,
ঃস্কুলে কাল যাস ঘরদ্বোর পরিষ্কার করতে হবে,
রমা সোজা বদরের রুমে গেল।চেয়ারটাতে বসতে ইচ্ছে করছিল,পরক্ষনে ভাবল যে, না থাক এটায় বদরকেই মানায়।ঘরটা গোছাতে লাগল, সব কিছু এলোমেলো, জুতো, মোজা, ধুতি, পাজামা, পান্জাবি, বই, খাতা, কলম ইত্যাদি, বিছানার চাদরে সব জমা করল,বই খাতা গুলো টেবিলে সাজালো. জুতো মোজা রেকের নিচে রাখল, ধুতিটা হাতে নিতেই মনে হলো, বদরের শরীরে গন্ধ।হঠাৎ-ই ধুতিটা বুকে চেপে ধরেই কেঁদে ফেলল, চোঁখ দিয়ে জরজর করে জল গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা। তারপর রুমের দরজা বন্ধ করল
রমার মা উঠোনেই ছিল, দরজা বন্ধ করতে দেখেই বলে উঠল ,
ঃকি করতেছিস ওখানে
প্রথমে কোন সারাশব্দ করল না, তার পর আবার বলল ,,ঃরমা----
এবার উত্তর দিল,ঃরুম পরিষ্কার করছি মা--
মা তেমন কিছু বলল না।রমা, রুমের ভিতরে ধুতিটা গায়ে পেচিয়েই খাটের উপর বসে মনে মনে হাসতে লাগল।ঘন্টা খানেক পর দরজা খুলল, বিছানার চাদরে মোড়ানো ধুতি, পায়জামা, পাঞ্জাবি নিয়ে। এরপর মাকে বলল
ঃমা আমি কাপড় গুলো দুইবো?
ঃ রোদে মেলে দিস
১৫
বাড়ির পাশেই পুকুরপাড়, সাধারনত এ সময় পুকুরে কেউ থাকে না। রমা আস্তে আস্তে পুকুরপাড়ে নামল, রমা এই প্রথম অন্যের কাপড় ধৌত করতে যাচ্ছে।কেননা (বিপিন) তাঁর দাদার কাপড় চোপড় গত তিন বছরে স্পর্ষ করেনি। আজ যাচ্ছে বদরের কাপড় ধৌত করতে।
পাঠকগণ,তবে কি রমা বদলে যাচ্ছে নাকি এর মধ্যে কোন গুপ্তধনের রহস্যে জরিয়ে যাচ্ছে।
পরদিন হাটবার, এখানে এই একটাই হাট বাড়ি থেকে অল্প একটু দুরে। মা সকাল বেলা নারায়ন ঠাকুরের বাড়ি গিয়েছিল।কারণ, ঠাকুর যেন বদরকে আসবার জন্য পাটহাটে লেকজনকে ব'লে দেয় তার জন্য।
রমা চলে যায় স্কুলে। টিফিনকালে বিথী বলল,
ঃকি রে দুগগা বদরকে খবর দে --পারলি না তো -তুই ওকে ধরে রাখতে।
ঃহেড মাষ্টার মশাইকে বলে দিবো
ঃডরাই -না
রমা বিথী কে ভয় দেখাইতে চেয়েছিল, কিন্তু বিথী ভয় পেল না। রমা ক্লাসেই বসে রইল, বিথী কে আজকাল সহ্য করতে পারেনা। বিথী ক্লাস ছেড়ে বাইরে গেল।আজকাল রমার এসব শুনতে ভাল লাগে না কারণ কথায় কথায় সবাই বদরের প্রসঙ্গ টানে
বদরের অনুপস্থিতি তে রমাও নিজেকে আর আগের মত স্থির করতে পারতেছে না। দপ্তরী ছুটির ঘন্টা বাজালো, ছুটি হলে বিথী ইচছে করেই রমার পিছু নিল,বলল
ঃ রমা, তুই ছোটবেলার বন্ধু আমার জন্য কিছুই করবি না?
ঃ না-না- না- না
ঃকিন্তু কেন
ঃজানি না--
ঃবল আমাকে বাঁধা দিবি না।
ঃ দেবো -
ঃকেন
ঃ বললাম তো, জানি না।
ঃ আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাস?
রমা বিথীর আর কোন কথার জবাব দিল না। হেটে হেটে বাড়ির পথ ধরল,
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন